ভালো তৃণমূল কোথায় পাবেন ? এই প্রশ্ন খুব আমার কাছে কঠিন ছিল না, আছে কিছু ভালো তৃণমূল। একেবারে সত্যি কথা যে তৃণমূলের লোকজন চোর ছাড়া আর কিছু ছিল না। যারা দু-নম্বরি আয় করতে চেয়েছিলেন তারা তৃণমূলে ভিড়ে ছিলেন। উপর থেকে নিচতলা পর্যন্ত দুর্নীতি আর দুর্নীতি। বিগত জমানায় আমাদের হাওড়ার ডিপিএসসিতে এবং সেকেণ্ডারি ডি.আই অফিসে একদল শিক্ষক এসে নাকি প্রতিদিন বসে থাকতেন " এদের নাম দেওয়া হয়েছিল দালাল।" এরা স্কুলে পড়াতেন না, এদের মধ্যে কয়েকজনকে দেখা গিয়েছিল বিএলও-ইউনিয়নের হয়ে কলকাতায় জয়বাংলা বলতেন, ইলেকশন কমিশনের ফুটপাতে। এরা দেশে বিদেশে নিত্য বেড়াতে যেতেন, কিন্তু একদিও ছুটি নেননি। যারা তৃণমূলের শিক্ষক হিসেবে প্রশাসনের হেডে বসেছিলেন তারা বেমালুম দু-জায়গায় বে-আইনিভাবে বেতন নিয়েছেন। এইসব শিক্ষক দু হাতে পয়সা কামিয়েছেন। লক্ষ লক্ষ টাকা তোলা উঠেছে, ডিআই অফিসগুলোতে। শিক্ষকরা যেসব পেনশন ফাইল জমা দিয়েছেন তার ফয়সালা হয়নি দীর্ঘদিন, সঙ্গে পয়সা না দেওয়ার ফলে। ছুটি অনুমোদনে পয়সা, পিএফ লোনে পয়সা, বদলি হলে তো মোটা টাকা। কয়েক বছর আগে গ্রামের সমস্ত শিক্ষক স্কুল খালি করে শহরে চলে এলেন, তাদের দিতে হয়েছিল কাউকে দু লক্ষ কাউকে পাঁচ লাখ পর্যন্ত। আমাকে মিউটেশনের জন্য দিতে হয়েছে দেড় লক্ষ। টাকা। তোলার সীমা পরিসীমা ছিল না। তাই ভালো তৃণমূল খুঁজে পাওয়া খুব দুষ্কর।
কিন্তু আমি হাওড়ার ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা। করোনার সময় আমার ওয়ার্ডের তৃণমূলের সভাপতি মুন্না সিং মারা গেল। ওই মুন্না বেঁচে থাকলে বলতে পারতাম সৎ তৃণমূল। ওর ভাই-রা এখনও তৃণমূল করে এবং ওরা এখনও সৎ। কিন্তু বাদবাকি তৃণমূলের কেউ সৎ নয়। গতকাল হাওড়া ডিপিএসসিতে একবার গিয়েছিলাম। একজন সহকারী বিদ্যালয় পরিদর্শকের ঘাড়ে পাহাড় প্রমাণ কাজ চাপানো হয়েছে। সে নাজেহাল। সৎ হলেও ওকে তো তৃণমূল আমলে চোরেদের সঙ্গে ওঠাবসা করতে হলো, তবে ওর গায়ে কাদা লাগেনি, কারণ তৃণমূলের লোকজন একটা চ্যানেল তৈরি করে ফেলেছিল তৃণমূল আমলে। তারা অফিসগুলো থেকে কাজ করে নিয়ে যেতো এবং বাইরে বেশ ভালো রকমের উপার্জন করতো। এখন এইসব লোকজন বিজেপির শিক্ষক সেলে ঢোকে কিনা দেখার।
আমার সঙ্গে বিজেপির বেশ কিছু শিক্ষক সদস্যদের পরিচয় রয়েছে। তাদের সঙ্গেও কথা বলছিলাম। বিজেপির অধ্যাপক আছেন, ডাক্তাররা রয়েছেন এবং আরও গণ্যমান্য সকলে রয়েছেন। তাঁদের সকলকে বলবো এই চোর-জোচ্চর তৃণমূলীদের নিয়ে নিলে কিন্তু খুব প্রবলেম হবে। এমনিতে বহু প্রাথমিক শিক্ষক যারা বিজেপির সঙ্গে রয়েছেন তাঁদের কেউ কেউ আমার সঙ্গে ফেসবুকেও আলাপ আলোচনা হয়। সবচেয়ে আশ্চর্যজনক যে এই গত ১৫ বছর অফিসগুলোকে মমতা ব্যানার্জী জেনেবুঝে মাঠ ময়দান করে রেখেছিলেন একেবারে নিয়োগ হয়নি। যদিও এখন কাজ অনেকটাই কম্পিউটারে হয় তাই রক্ষে। প্রশাসনিক কাজে যে গভীর দুর্নীতি রয়েছে খুচখাচ পয়সা দিয়ে যে চিরকাল কাজ হয়, তাকে ভাঙা কঠিন। বাম আমলে নেতারা টাকা পয়সা খেতো না। কিন্তু মাঝপথে টাকা পয়সা চালাচালি যে হতো না এমন নয়। হতো। কিন্তু অনেকটা চাঁদা দিয়ে হতো। আমি চাইলে মাত্র জন প্রতি ১০০ টাকা নিলে বাম আমলে একটা ফ্ল্যাটের টাকা উঠে যেতো। টাকা নেওয়া বন্ধ করা হয়তো যায় না, কিন্তু উপর থেকে নিচ তলা পর্যন্ত যে তৃণমূল আমলে চুরি হতো, চড় চাপড় মার খাওয়া দেখে তা আজ সকলে জানছে।
ভালো তৃণমূল যখন শমীক ভট্টাচার্য বলেছেন তখন বুঝতে হবে বিজেপির সাংগঠনিক স্বার্থে এইরকম লোকজনকে নিতে হবে। কিন্তু যেভাবে একের পর এক নেতা-নেত্রীরা ( ঋতব্রত) লাইন দিতে শুরু করেছে তা বিজেপি নেতৃত্ব কীভাবে আটকাবে তা বড় চিন্তার বিষয়। তবে প্রশাসনিক সংস্কার করতে বিজেপিকে প্রশাসনে কিন্তু নিজেদের কিছু লোককে পুশ করতেই হবে। ক্লারিক্যাল স্তরে অফিসে অফিসে কিন্তু বিজেপির নিজস্ব কিছু লোকজন থাকা দরকার। শমীক ভট্টাচার্য ও শুভেন্দু অধিকারীর কাছে নির্দিষ্ট কিছু প্রস্তাব আমি পাঠাবো। কারণ বামেদের ৩৪ বছর থাকার জন্য কিছু প্রশাসনের নিচু লেভেলে ও শিক্ষকতায় তারা ব্যাপক কেডার প্রবেশ করিয়ে ছিলেন। চুরি আটকাতে এর দরকার রয়েছে তবে বাম আমলেও দেখা গেছে এদের কেউ কেউ ফ্রাঙ্কেনস্টাইন হয়ে গিয়েছিলেন।
তবে আমাদের বিকাশ ভবনে আমাদের রিক্রুটমেন্ট ফাইল যিনি দেখতেন সেই "আলোক-দা" র প্রসঙ্গ এখানে তুলবো। ওনার টাইটেলটা ভুলে গেছি। বিকাশ ভবনে উনি সিপিআইএমের খোদ লোক ছিলেন। নিউ সেক্রেটারিয়েট থেকে উনি আমাদের নিয়োগের মতো গুরুত্বপূর্ণ ফাইল দেখাশোনা করতেন। সিপিআইএমের সংগঠন কত মজবুত ছিল এটা থেকে বোঝা যায়। ওই আলোক-দার সঙ্গে আমার নামের মিলমিশ থাকায়, উনি আমাকে পছন্দ করতেন আমার হাতের লেখার জন্য। ওনাকে কখনও আমি সামান্য এক কাপ চা খাওয়াতে পারিনি। বরং আলোকদা আমাকে টোস্ট-চা খাইয়েছেন। আমার পুরো চাকরির লাইফটা ওনার কাছে বহুবার গেছি, আমার সব প্রবলেম বিনা পয়সায় সল্ভ করেছেন। শুধুমাত্র ওনার লেখার ভুলে নিয়োগের প্যানেলে, প্রথমে আমার নামের বদলে অন্য একজনের নাম তুলেছিলেন তার নাম কেন কাটা হয়েছে এবং তার জায়গায় আমার নাম কেন ঢোকানো হয়েছে, এই নিয়ে সে কি তুলকালাম কান্ড। আমার চাকরি নিয়ে যে প্রথমেই এইরকম দুর্ঘটনা ঘটেছিল জানতাম না। নিউ সেক্রেটারিয়েটের দেওয়ালে টাঙানো প্যানেলে দেখি টাইপ করা কাগজে ১৮০ জনের প্যানেলে ১৫০ নম্বরে কেটে হাতের লেখায় আমার নাম। সেই প্রথম আলোকেদার সঙ্গে আলাপ। উনি রেজিস্ট্রার খুলে দেখালেন খাতাতে প্রথমে আমার নাম ওঠেনি। তারপর উনি জাবদা খাতা বার করে দেখালেন, সেখানে রিটিনের নম্বর/ কোয়ালিফিকেশনের নম্বর/ ইন্টারভিউয়ের নম্বর সব যোগ করে আমার নাম রয়েছে ১৫০নম্বরে কিন্তু ভুল করে ১৯০-এ যার নাম রয়েছে তার নাম উঠে গিয়েছিল। কিন্তু প্যানেল হয়েছে ১৮০ জনের। অর্থাৎ একজন ফেলুর নাম উঠে গেছে। ফাইনাল মেলাতে গিয়ে ধরা পড়ে। ওই ব্যাখ্যা শুনে তো আমার বুক উড়ে গিয়েছিল। সেই প্রথম আলোকদার সঙ্গে পরিচয়। তখন দেখেছিলাম একটা সৎ লোককে বামেরা ওই জায়গায় বসিয়েছিল। কিন্তু দুঃখের কথা, ২০১১-এ তে আলোক দা এই সরকারের আমলে আর চাকরি করতে চাননি। উনি অবসর নিয়েছিলেন তৃণমূল আমলে। এইরকম একজন নির্ভীক এবং সৎ মানুষ আর দেখতে পাইনি। শেষ দিন পর্যন্ত ওনার কাছে একবার গিয়েছিলাম উনি ভোলেননি ওই একটা পেন মিসটেকের কথা। বিজেপিকে কিন্তু ভালো প্রশাসন চালাতে এইরকম সৎ এবং নিজেদের লোকজনকে বসাতে হবে প্রশাসনে। হয়তো শমীক ভট্টাচার্য এইরকম ভালো তৃণমূলের কর্মীদের কথা বলেছেন। ©® অলোককুমার কুণ্ডু , প্রাক্তন সহকারী বিদ্যালয় পরিদর্শক।
মন্তব্যসমূহ