আমাদের নিজস্ব মাতৃভূমি চাইঃ ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় বাস্তবায়ন করে দেখিয়েছিলেন। লেখাঃ অলোককুমার কুণ্ডু ( প্রাক্তন সহকারী বিদ্যালয় পরিদর্শক)
•কেন পশ্চিমবঙ্গ দিবস। অখণ্ড বাংলা দুই টুকরো হয় এবং পশ্চিমবঙ্গের আজ ভারতভুক্ত হয়।
• ৫ এপ্রিল ১৯৪৬ ( ৪-৬ এপ্রিল, ১৯৪৭) সম্মেলনে বাংলাকে পাকিস্তানের বাইরে রাখার পক্ষে প্রস্তাব গৃহীত হয়। শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ৫ই এপ্রিল তারকেশ্বরে হিন্দু মহাসভার সম্মেলন, বক্তৃতায় বঙ্গভঙ্গকে সাম্প্রদায়িক সমস্যার একমাত্র সমাধান হিসেবে প্রস্তাব করেছিলেন। তিনি দৃঢ়কণ্ঠে ঘোষণা করেছিলেন: "আমাদের মাতৃভূমি চাই, আর আমরা তা অর্জন করবই"। বাংলাকে পাকিস্তানের কবল থেকে ছিনিয়ে আনা - বাংলার পশ্চিমাংশকে পাকিস্তানের কবল থেকে রক্ষা করে ভারতের অন্তর্ভুক্ত রাখার দাবি ছিল পশ্চিমবঙ্গ গড়ার। এরপর শ্যামাপ্রসাদ বাংলার চতুর্দিকে বেরিয়ে পড়েন জনগণকে বোঝাতে। তাই আজ বিজেপির এই ২০/৬/২৬-এর আয়োজন এক অর্থে ঐতিহাসিক এবং জয়যাত্রার অংশ। ওইদিন হিন্দু বাঙালিদের পক্ষে গরিমার দিন।
• হিন্দু মহসভায় আওয়াজঃ হতে পারে বৃটিশ বাংলায় ভোটাভুটির অনেক কলাকৌশল ছিল। হিন্দুদের মধ্যে বহুজন তখন কংগ্রেসকেই তাদের দল মনে করতো। কিন্তু হিন্দু মহাসভার উদ্যোগেই পশ্চিমবঙ্গ আলাদা হবে এটার আওয়াজ যে তারকেশ্বর থেকে উঠে ছিল, এটা মিথ্যা নয়। কারণ ২০শে জুনের অনেক আগে ৪ এপ্রিল তারকেশ্বরে হিন্দুদের সম্মেলনে হিন্দু মহাসভায় এই আওয়াজ উঠে ছিল।
• মুসলমানদের জন্য যেমন তাদের জাতের দল ছিল মুসলিম লীগ। কিন্তু সেই হিসেবে কোনো হিন্দু লীগ তৈরি হয়নি কখনও। হিন্দুরা এতটাই জাতপাতের ঊর্ধ্বে চিরকাল যে, তারা সেই সময় কংগ্রেসকেই বিশ্বাস করে ছিল। কিন্তু হিন্দুদের প্রোটেকশন নিয়ে প্রথম প্রস্তাব কংগ্রেস ওঠায়নি। পরবর্তীতে হিন্দুদের প্রবল চাপে কংগ্রেস ভোট দিতে বাধ্য হয়েছিল হিন্দুদের পক্ষে। তার আগেই নোয়াখালীতে গিয়ে হিন্দুদের দ্বারা ঘেরাও হয়েছিলেন গান্ধীজি। মুসলমানদের সঙ্গে তাদের মহল্লায় ঘোরার কথা ছিল গান্ধীজির। কিন্তু তা আর হয়ে ওঠেনি। হিন্দু যুবকরা গান্ধীজিকে ছাপার অযোগ্য গালাগালি দিয়েছিলেন। নোয়াখালীতে হিন্দুদের ওপর অকথ্য অত্যাচার হয়েছিল। খুন ও ধর্ষণের সেই রাতভর স্মৃতিতে হিন্দুরা টাকা পয়সা ঘরবাড়ি ছেড়ে, পূর্ব বাংলা ছেড়ে চলে আসতে বাধ্য হয়েছিল। তাই কংগ্রেস আজ যে, বলছে তাদের ভোট না পেলে পশ্চিমবঙ্গ হতো না, এটা তাদের কৃতিত্ব না তাদের লজ্জা কোনটা জানি না। বামেরাও অবশ্য পশ্চিমবঙ্গের জন্মের জন্য ভোট দিয়েছিল কিন্তু তখন যেহেতু হিন্দুরা অধিকাংশই বাম কংগ্রেসর মধ্যে ভাগাভাগি করে রাজনৈতিক দলগুলিতে অবস্থিত ছিল। তাই স্বাধীনতার আগে ও পরে, হিন্দু মহাসভার এই পশ্চিমবঙ্গ তৈরির প্রথম প্রস্তাবকে কখনও এই দুটি দল এই দেশে মান্যতা দেয়নি। হিন্দু মহাসভার ভোট ছিল একটি। বরং সেটাকেই বড় করে তুলে ধরতে কংগ্রেস ও বামপন্থীদের উদাহরণের অভাব হয়নি। তাতে কি? এই প্রচেষ্টার মূলে যে, আসলে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ছিলেন এটা তো অস্বীকার করার উপায় নেই। পুরনো কংগ্রেস কিংবা ৩৪ বছরের শাসক বা ১৫ বছরের তৃণমূল শাসক দলগুলো থেকে কখনও পশ্চিমবঙ্গ কীভাবে তৈরি হয়েছিল সে সম্পর্কে টুঁ শব্দটি করা হয়নি। কখনও এক কলম তাদের সরকারের পক্ষ থেকে আজকের ২০,জুন সম্পর্কে কখনও কিছু উল্লেখ করা হয়নি। আমাদের ছেলেপুলেরা যে, কিছু পড়ে জানবে, তারও ব্যবস্থা করেনি বিগত সরকারগুলো। বিশেষ করে আজকের তৃণমূল কংগ্রেস পশ্চিমবঙ্গকে একটি সেক্যুলার প্রধান রাষ্ট্র হিসেবে প্রথমে মানলেও, স্কুল সিলেবাসে বিদেশি শব্দ যুক্ত করে বুঝিয়ে দেয় যে, পশ্চিমবঙ্গে জাতপাতের রাজনীতি হচ্ছে মূখ্য বিষয়। বৃটিশদের (১৯০৫) বঙ্গভঙ্গ এবং তার পরবর্তী পর্যায়ে কার্জন ভারতের হিন্দু মুসলমান এই জাতির মধ্যে একটা প্রবল প্রাচীর গড়ে তোলার মধ্যে দিয়ে তাঁদের শাসন কায়েম রাখতে চেয়েছিল। এছাড়া স্বাধীন ভারতের শুরু থেকেই এতদিন ধরে আমরা, খানিকটা নেহরু সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম। নেহরুর প্রত্যক্ষ মদতে শ্যামাপ্রসাদের অস্তিত্বকে বাঙালির কাছে তুলে ধরার প্রচেষ্টা খানিকটা খর্ব করার চেষ্টা হয়েছিল।
• শ্যামাপ্রসাদ ও তারকেশ্বর পর্বঃ বাংলাকে পাকিস্তানের বাইরে রাখার পক্ষে প্রস্তাব গৃহীত হয় শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের উদ্যোগে, "তারকেশ্বরে অনুষ্ঠিত হিন্দু মহাসম্মেলনে।" দেশভাগের আগে মহম্মদ আলি জিন্নাহ সমগ্র পূর্ব ভারতকে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত করার পক্ষে ছিলেন। সেই সময় শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় এই মতের প্রবল বিরোধিতা করেন এবং ১৯৪৭ সালের ৪ এপ্রিল তারকেশ্বরে অনুষ্ঠিত হিন্দু মহাসম্মেলনে বাংলাকে পাকিস্তানের বাইরে রাখার পক্ষে প্রস্তাব গৃহীত হয়। সেখানে তৎকালীন বহু বুদ্ধিজীবী এই মতে সামিল হয়েছিলেন।
• মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর অভিমতে তুষ্টি করণ রাজনীতির উল্লেখঃ হিন্দুদের কোনঠাসা করে, ভোটের জন্য পশ্চিমবঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে তুষ্টি করণের রাজনীতি চলছে বলে, নির্বাচনের প্রাক্কালে বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বিভিন্ন সভায় বলেছিলেন। অতি সম্প্রতি তিনি আলিপুরের ধনধান্য অডিটোরিয়ামে, সনাতনী সমাজের এক বিশেষ অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাস, দেশভাগ এবং রাজ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে বক্তব্য রেখেছিলেন। ওইদিন তিনি দাবি করেন, ভোটব্যাঙ্কের রাজনীতির কারণে দীর্ঘদিন ধরে রাজ্যের প্রকৃত উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয়েছে এবং তুষ্টিকরণের রাজনীতি বাংলার ঐতিহ্য ও ইতিহাসকে আড়াল করে রেখেছিল। অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বলেন, বর্তমান প্রজন্মের যুবসমাজের জানা উচিত পশ্চিমবঙ্গ কীভাবে গঠিত হয়েছিল এবং দেশভাগের সময় বাংলার ভবিষ্যৎ নির্ধারণে কারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। তাঁর বক্তব্যে বিশেষভাবে উঠে আসে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের নাম। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, দেশভাগের আগে মহম্মদ আলি জিন্নাহ সমগ্র পূর্ব ভারতকে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত করার পক্ষে ছিলেন। সেই সময় শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় এই বিষয়ের বিরোধিতা করেন এবং ১৯৪৭ সালের ৪ এপ্রিল তারকেশ্বরে অনুষ্ঠিত হিন্দু মহাসম্মেলনে বাংলাকে পাকিস্তানের বাইরে রাখার পক্ষে প্রস্তাব গৃহীত হয়। শুভেন্দু অধিকারী আরও দাবি করেন যে, ওই প্রস্তাবের ভিত্তিতেই পরবর্তীকালে বাংলার আইনসভায় বিষয়টি উত্থাপিত হয় এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থনে তা গৃহীত হয়। তাঁর মতে, পশ্চিমবঙ্গের অস্তিত্ব রক্ষার ইতিহাস বর্তমান প্রজন্মের সামনে আরও বেশি করে তুলে ধরা প্রয়োজন। এরপরই তিনি নাম না করে পূর্বতন রাজ্য সরকারের (তৃণমূল কংগ্রেস) সমালোচনা করেন। মুখ্যমন্ত্রীর অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে ভোটব্যাঙ্কের রাজনীতি এবং তুষ্টিকরণের কারণে পশ্চিমবঙ্গের উন্নয়নের প্রশ্ন পিছনে চলে গিয়েছিল। তিনি বলেন, বিভিন্ন সরকারি সিদ্ধান্ত এবং প্রশাসনিক পদক্ষেপের ক্ষেত্রেও ভোটের সমীকরণকে অগ্রাধিকার দেওয়া হত।
• তারকেশ্বর সম্মেলনঃ সমগ্র বাংলাকে পাকিস্তানের বাইরে রাখার পক্ষে প্রস্তাব গৃহীত হয় তারকেশ্বরে অনুষ্ঠিত হিন্দু মহাসম্মেলনে। প্রধান ভূমিকা ও অবদানঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের। পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য গঠনে ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও স্থপতিসুলভ। প্রকৃতপক্ষে তিনিই ছিলেন "পশ্চিমবঙ্গের জনক"— মূলত তাঁর প্রচেষ্টাতেই অখণ্ড বাংলার হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ পশ্চিমাংশ ভারতে থেকে যায় ১৯৪৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে হিন্দু মহাসভার নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠিত হয় এবং সারা বাংলায় শ্যামাপ্রসাদ বক্তৃতা-সফর শুরু করেন, তিনি জনসভাগুলিতে বক্তব্য রাখতে গিয়ে সমগ্র বাঙালির কাছে, বাংলা ভাগের প্রয়োজনীয়তা বোঝান, বিশেষ করে হিন্দুদের সংগঠিত করে, পশ্চিমবঙ্গের দাবিকে সামনে এনে প্রতিষ্ঠা করাই ছিল তাঁর সাধ এবং অবদান।
• মুসলিম লিগের ফাঁদঃ মুসলিম লিগের নেতা সুরাবর্দীর "অখণ্ড স্বাধীন বাংলা রাষ্ট্র" প্রস্তাবের ফাঁদ থেকে হিন্দু বাঙালিকে উদ্ধার করতে তিনি সমর্থ হয়েছিলেন বলে হিন্দু বাঙালিদের কাছে তিনি সেই সময় জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। তিনি ব্রিটিশ প্রতিনিধিদের বোঝানো থেকে ১৯৪৭ সালের ২৩ এপ্রিল লর্ড মাউন্টব্যাটেনকে বোঝান "কেন বাংলা ভাগ করা প্রয়োজন, ২ মে তাঁকে দীর্ঘ পত্র লেখেন, শ্যামাপ্রসাদ। কংগ্রেস নেতাদের কাছে আবেদনঃ শ্যামাপ্রসাদ কংগ্রেস নেতাদের কাছে আবেদন রাখেন যেন, বাংলা ভাগের দাবিকে তাঁরা সমর্থন সমর্থন জানান, শেষ মুহূর্তে কংগ্রেস শ্যামাপ্রসাদের এই দাবিকে সমর্থন করেন।
• গান্ধী-নেহরুকে বোঝাতে তিনি সমর্থ হয়েছিলেনঃ ১৯৪৭ সালের মে মাসের প্রথম দিকে মহাত্মা গান্ধী ও জওহরলাল নেহরুকে বাংলা ভাগের প্রয়োজনীয়তার কথা তিনি বলেন।
• তিনি জনসভার মধ্যে দিয়ে সারা বাংলায় একটি আন্দোলন গড়ে তোলেন। এই কারণে বারোটিরও বেশি জনসভায় শ্যামাপ্রসাদ বক্তৃতা করেছিলেন। বাংলা ভাগের দাবিতে, কংগ্রেসের সঙ্গে যৌথভাবে পাঁচটি সভা করেছিলেন তিনি।
• আইনসভায় প্রস্তাব পাশ হয় ১৯৪৭ সালের ২০ জুন বঙ্গীয় আইন পরিষদের পশ্চিমাংশের সদস্যরা** ৫৮-২১ ভোটে বাংলাকে দ্বিখণ্ডীকরণের প্রস্তাবকে পাশ করিয়ে হিন্দুদের জন্য একটি স্থায়ী বাসস্থানের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে সকলকে উদ্বুদ্ধ করেন।
• শ্যামাপ্রসাদের অবদান ও ইতিহাসের প্রয়োজনে বাংলা ভাগঃ প্রথমত ১৯৪৬ সালের "গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং" ও "নোয়াখালি গণহত্যা"-এর পর হিন্দু বাঙালির অস্তিত্ব বিপন্ন হয়েছিল। হিন্দু মহাসভার একজন মাত্র সদস্য ছিলেন তিনি তবু ১৯৪৭ সালের ২০ জুন, শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে প্রাদেশিক আইনসভায় জন্ম নিয়েছিল পশ্চিমবঙ্গ, যার ফলস্বরূপ বাঙালি হিন্দুদের জন্য স্থির হয়েছিল, একটি নিরাপদ আশ্রয়-পশ্চিমবঙ্গ। এই বাস্তবতা আজ ভূলুণ্ঠিত হয়েছে। এর ফলে তৎকালীন সময়ে মুসলিম লিগ সমগ্র বাংলাকে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত করতে ব্যর্থ হয়। শ্যামাপ্রসাদের দৃঢ় উদ্যোগ ও প্রতিহতকরণে তৈরি হয়েছিল পশ্চিমবঙ্গ, এই কথা বাঙালিররা আজ ভুলতে বসেছে। ২০ জুন ১৯৪৭ তারিখের সঙ্গে দেশ বিভাজনের ইতিহাস জড়িয়ে রয়েছে। বাংলা ভাগের সিদ্ধান্ত বৃটিশদের সময় পাশ হলেও অতি সম্প্রতি ২০২১ সালে বিধানসভায় উত্তপ্ত হয়ে ওঠে—তৃণমূল-শাসকদল কোনওভাবেই মানতে নারাজ হয়ে ওঠে যে, এই দিনের সঙ্গে বাঙালির ইতিহাস-নির্ভরতা জড়িয়ে রয়েছে। তখন বিজেপি ছিল এখানে বিরোধী দল।
• তারকেশ্বরে ৪ এপ্রিল কি হয়েছিল হিন্দু মহাসভার সম্মেলনঃ ১৯৪৭ সালের ৪ এপ্রিল (শুক্রবার) থেকে ৬ এপ্রিল তারিখ পর্যন্ত তারকেশ্বরে বঙ্গীয় হিন্দু মহাসভার একটি ঐতিহাসিক তিনদিনের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এই সম্মেলনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ছিল: ওই সভায় সভাপতি ছিলেন বঙ্গীয় প্রাদেশিক হিন্দু মহাসভার কার্যকরী সভাপতি নির্মলচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। ওই সভা থেকে গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা করা হয়েছিল, সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনে (৫ এপ্রিল)। ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় দৃঢ়কণ্ঠে ঘোষণা করেছিলেন: "আমাদের মাতৃভূমি" — অর্থাৎ বাংলা ভাগের দাবি উত্থাপন করে পশ্চিমবঙ্গকে ভারতে রেখে দাবি তোলা হয়। মূল দাবি ছিল বাংলা ভাগের দাবি। তারকেশ্বরের মাটি থেকেই উঠেছিল, যা হিন্দুদের ভারতে রেখে দেওয়ার লক্ষ্যে ছিল একটি বলিষ্ঠ যুগান্তকারী পদক্ষেপ। এই সম্মেলন থেকেই বাঙালি হিন্দুর হোমল্যান্ড বা "পশ্চিমবঙ্গ গঠন"-এর প্রস্তাব ক্রমে জোরালো হয়, যা ১৯৪৭ সালের ২০শে জুন বাংলা আইনসভায় ৫৮-২১ ভোটে পাশ হয়।
• শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও জনসংঘ: ১৯৫১ সালের ২১ অক্টোবর, ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় দিল্লিতে "ভারতীয় জনসংঘ" প্রতিষ্ঠা করেন। জনসংঘ থেকে রাজনৈতিক দল হিসেবে ভারতীয় জনতা পার্টিতে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের স্বপ্নের দলের পরিবর্তন হয়েছে অনেককাল। ইতিমধ্যে বিজেপি, গত দু'বছর ধরে ২০ জুনকে 'পশ্চিমবঙ্গ দিবস' হিসেবে তুলে ধরতে শ্যামাপ্রসাদের ভূমিকাকে তুলে ধরতে বিজেপি বদ্ধপরিকর। তিনি যে জিন্নার অভিন্ন বাংলার বিপক্ষে ছিলেন এবং সে কারণেই ২০ জুন যে, পশ্চিমবঙ্গ নামের উৎপত্তি হয়েছিল এই ইতিহাসকে ভুলিয়ে দিতে চাইলেও এই প্রথম বিজেপি সরকার পশ্চিমবঙ্গে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং তাই বিজেপি শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের যুক্তিকে জোরালোভাবে এইবার ঘোষণা করেছে। ২০ জুন বাংলা ভাগের যন্ত্রণাময় ইতিহাসের প্রতীক এবং পশ্চিমবঙ্গ গঠিত হওয়ার পর্ব।
• প্রকৃতপক্ষে বিজেপি ২০১৩ থেকে ২০ জুন পশ্চিমবঙ্গ দিবস হিসেবে উদযাপন করে থাকে, কারণ তারা এই দিনকে "বাঙালির অস্তিত্ব ও আত্মপরিচয় রক্ষার গৌরবময় স্মারক" হিসেবে দেখে থাকে। হঠাৎ করে ২০২৩ থেকে তৃণমূল কংগ্রেস পয়লা বৈশাখ (বাংলা নববর্ষ)-কে পশ্চিমবঙ্গ দিবস ঘোষণা করেছিল, কিন্তু ২০২৬ সালে নবান্ন থেকে সরকারিভাবে ২০ জুনই পশ্চিমবঙ্গ দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। তৃণমূল সরকারের বাংলা নববর্ষকে পশ্চিমবঙ্গ দিবস ভাষাকে খারিজ করে দিয়েছে। আজকের এই দিনটি পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের প্রতিষ্ঠা দিবস হিসেবে এখন থেকে সরকারি ভাবে এই দেশে উদযাপিত হবে। কিন্তু কংগ্রেস এর সমর্থনে ভোট দিয়েও কেন তারা ১৯৪৭-সালের পর থেকে কখনও পশ্চিমবঙ্গ দিবসের কথা ভাবেনি,
এটা হচ্ছে এই শতাব্দীর সবচেয়ে আশ্চর্যজনক একটি প্রশ্ন।
•এত দিন তবে কি কারণে পশ্চিমবঙ্গ দিবস নিয়ে কেউ মাথা ঘামায়নি কেন ? ইতিমধ্যে এই উঠেছে। কেন এত দীর্ঘদিন পশ্চিমবঙ্গে উপেক্ষিত হয়েছে। দেশভাগের যন্ত্রণার কথা বলে আসল বিষয়টিকে কিন্তু কি কংগ্রেস কি বামপন্থীরা এই রাজ্যের মানুষকে বিভ্রান্ত করেছিল তার কোনো উত্তর নেই। পশ্চিমবঙ্গ দিবস (২০ জুন) এতদিন জনসাধারণ বা রাজ্যের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলি নিয়ে মাথা ঘামায়নি মূলত দুটি প্রধান কারণে। বলা হয়েছে এটা ইতিহাসের যন্ত্রণাময়তা ও বিভাজনের প্রতীক। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ যে তৈরি হয়েছিল তাই যে হিন্দুদের কাছে উৎসব ছিল, তার তাৎপর্য খোঁজার চেষ্টা কেউ করা হয়নি। কেন উৎসবের তাৎপর্য কার্যত খুঁজে পায়নি-- পশ্চিমবঙ্গবাসী! এটাও তো তাহলে একটি লজ্জার বিষয়।
• রাজনৈতিক দলগুলির ন্যক্কারজনক অবস্থানঃ
কংগ্রেস, সিপিআই(এম), তৃণমূল কংগ্রেস দীর্ঘ দশকগুলি তারা ক্ষমতায় ছিল কিন্তু তারা প্রতিষ্ঠা দিবস হিসেবে উৎসব পালন করেনি।
বাঙালির ইতিহাস ও সংস্কৃতিতে, এমন একটি দিনের গুরুত্বের কথা বড় একটা শোনা যায়নি আগে।
©® অলোক কুমার কুণ্ডু ( প্রাক্তন সহকারী বিদ্যালয় পরিদর্শক)
মন্তব্যসমূহ