সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান


আসলে তুমি আমার হিরো••• লেখকঃ অলোক কুন্ডুর ফটোগ্রাফির জগৎ 

( লেখাটি কপিরাইট শ্রেণিভুক্ত) 


* সাম্প্রতিক বাংলা ছায়াছবি প্রজাপতি-কে নিয়ে অলোক কুমার কুন্ডু-র দীর্ঘ প্রতিবেদন। লেখাটি মৌলিক এবং বাংলা সিনেমার জন্য এত বড় প্রতিবেদন এই প্রথম লেখা হল। 

* বাংলা সাহিত্যে-গল্পে পিতাকে প্রোজেক্ট করার সিদ্ধান্ত এই প্রথম না হলেও- সাহিত্যে তো ছিলই। বিভূতিভূষণের হরিহরকে মনে পড়ে আপনাদের ? পিতৃ-কেন্দ্রিক চরিত্র দিয়েই তো পথের পাঁচালী শুরু করেছিলেন তিনি। যারা সিনেমা নামায় যখন, তাদের অনেক রকম ভয় ভীতি থাকে ফিল্ম তৈরির সময়। কোনওটা যদি দর্শক না নেয়, তাই যতক্ষণ না একটি শো হয় ততক্ষণ বোঝা মুস্কিল হয় ছবিটা দাঁড়াবে কিনা। উত্তমকুমারও তো বুঝতে পারেননি, ছোটি সি মূলাকাৎ কতটা ফ্লপ করবে। 

* প্রথমেই বলে রাখি প্রজাপতি ছবিটি কোনও আর্ট ফিল্ম নয় কিংবা প্যারালাল ফর্মূলায় বানানো কোনও এক ব্যতিক্রমী চলচ্চিত্রও নয়। একেবারেই মূল ধারার প্রযোজনা এবং সমস্ত সারল্য দিয়ে ছবিটি বানানো। ভজকট, মারদাঙ্গা, সাসপেন্স, থ্রিলার এই ছবিতে অমিল। একেবারে নব্বই দশকের কাহিনীধর্মী ছবি লাঠি, শেতপাথরের থালার মতো অথবা সরল ফ্যামিলি পিকচার প্রজাপতিকে বলতেই হবে। প্রজাপতি কিন্তু

নীল আকাশের নীচে, পলাতক, অভিযান, বাঞ্ছারামের বাগান, খোকবাবুর পরিবর্তন-এর মতো অত উচ্চ মানের ছবি না হলেও একদম মৌলিকত্ব নিয়ে রিলিজ হয়েছে। আর একমাস জবরদস্ত বাজার করেছে। 


* কিন্তু এই ছবিটি এমন নয় যে দেবের কোনও অবদান নেই। দেবকেও আদর্শ পুত্র হিসেবে যা মানিয়েছে বোধহয় আর কাউকেই তা মানাতো না। দেব তো শুধু পাগলু আর খোকাবাবু করেননি। চাঁদের পাহাড়, আমাজন অভিযানও দেবের সুপার হিট ছবি, টনিক তো বটেই। বিশেষ করে এ যুগের চাম্পিয়ন পরিচালক, কমলেশ্বর মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে কাজ করেছেন যে দেব, তাঁর অভিনয়, বোধ, ভাবনা সবকিছু প্রজাপতিতে যুক্ত হয়েছে। 

* তবে এই ছবিটির পিতা এবং মিঠুন চক্রবর্তী এখানে মিলে মিশে গৌরের মতো একটি মৌলিক, আদর্শ, পূর্ণাঙ্গ পুরুষের চরিত্র হিসেবে সকলের মন কেড়ে নিয়েছেন।

গৌর শেষ বয়সে গিয়ে একটা বড় সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যা বাংলা সমাজের কাছে এক বিপ্লবী সিদ্ধান্ত, কারণ পুরুষ তান্ত্রিক এই সমাজ ব্যবস্থার উল্টো পথে তো এতদিন তিনি চলেছেন। বাংলা সাহিত্য থেকে সমাজ প্রস্তুত ছিল বউ মারা গেলে বিয়ে করা পুরুষদের অবধারিত অধিকার। বউ মারা গেলে স্বামীর দ্বিতীয় বিয়ে সমাজ স্বীকৃত বিষয় যখন, সেদিকে তিনি একদমই যাননি। মোদ্দা কথা হ'ল চিত্রনাট্যে, গৌর হিসাবে মিঠুনের জয়জয়কার এই ছবিতে অব্যাহত। আগের সেই যৌথ পরিবার নেই। মিঠুনও তার ছোট সংসারের এক সর্বময় কর্তা নয় এখন, পুত্র যথেষ্ট অ্যাডাল্ট, মোর অ্যাডাল্ট, তাই সেও সমান কর্তা এই ছবিতে। মুস্কিল হ'ল এই যে বাবারূপী মিঠুনের উদ্দেশ্যে তৈরি হওয়া এই গানটাই যত গন্ডগোলের ( রাজনৈতিক) মূল কারণ হিসেবে রয়েছে বলেই এই প্রতিবেদকের মনে হয়েছে। কিন্তু রাজনীতি ছেড়ে যদি সিনেমাটির সিট আঁকড়ে বসে পড়েন তবে দেখবেন এই গানের মধ্যে পিতা-পুত্রের সুখ-দুঃখের সম্পর্কগুলি যতখানি এসেছে, পরিচালক ওই গানের মধ্যে গ্যাসের বার্নারে বসানো উথলে ওঠা দুধ থেকে শুরু করে মালা অর্থাৎ শ্বেতাকে, মমতা শঙ্কর থেকে তার মেয়েক পর্যন্ত দেখিয়েছেন প্রত্যেকর বেদনা গুলি পুণরুদ্ধার করতে চেষ্টা করেছেন পরিচালক এই গানটির মধ্যে। অর্থাৎ গানটা শুধুমাত্র মিঠুন কেন্দ্রিক নয়। গানটি যেন আপনার আমার হয়ে উঠতে পেরেছে। অতএব রাজনৈতিক ধারণাকে গুলি মারুন। 


* গল্পাকার ও পরিচালক যৌথভাবে ভাবলেন বিয়ের আসর ও ওয়েডিং প্ল্যান এইসব যদি গল্পের একটা অনুসঙ্গ হয় তবে কেমন হবে। এখানে উল্লেখ্য দেবের আগের ছবি ছিল ট্যুরিজম ব্যবসা কেন্দ্রিক। দেব যে একজন এম.পি এবং তার ভাবনার মধ্যে পর পর দুটো ছবিতে বাঙালি ছেলেদের ব্যবসা করে দাঁড়াতে হবে এবং বেকারত্বের জ্বালায় পশ্চিমবঙ্গ ভূগছে এই বার্তা খুব নমনীয় করে দিতে চেয়েছেন, যেন সত্যিই তিনি এক আদর্শবান জনপ্রতিনিধি। কিন্তু এই ছবিতে এখানে দেবের অন্য কোনও ব্যবসা হলে তাতে কোনও নতুনত্ব থাকতো না। ওয়েডিং প্লান্যার ব্যবসা কি সুন্দর ভাবেই না একটা পিঁড়ি পেতে রেখেছিল প্রজাপতি সেখানে বসবে বলে।

* যখন ওয়েডিং প্ল্যানার টিমের সদস্যরা, তাদের কাজ নিয়ে  মেতে আছে এবং গর্বিত হচ্ছে কোনও এক বিয়ের আসরে, আর পর্দার পেছনে তখন বাজছে এক সুমধুর টাইটেল সঙ, "যদি কেউ বিয়ের ফাঁদে পড়তে চাও"... আর ঠিক তখনই দৃশ্য থেকে ক্যামেরা সরে গিয়ে স্বেতা ভট্টাচার্য ওরফে মালা-র হাস্যময় মুখটাকে ফোকাস করছে ক্যামেরা তখনও কিন্তু দর্শক বুঝতে পারেননা, যে শেষ দৃশ্যে জয় ও মালার মিল হবে, যা এই ছবির মূল উদ্দেশ্য। আসলে গল্পের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে দেব ওরফে জয়ের বিয়ে দেওয়া, এতে কোনও সন্দেহ নাই। কিন্তু ছবিটাকে রঙচঙে করতে ও ছবিকে সময়ের আড্ডায় জমিয়ে রাখতে এখানে বিষয়বস্তুতে নানা কম্পোজিশন ইনকরপোরেট করতে হয়েছে এবং সবকটি প্রসঙ্গ একেবারে ম্যাচ করে গেছে প্রজাপতির সঙ্গে। 

* তুমি যতক্ষণ না নিজে প্রজাপতি দেখতে যাচ্ছো ততক্ষণ তুমি -" হুইচ কুকিং ইনসাইড " এই গন্ধ নিতেই থাকবে তোমার কোনও বন্ধুর কাছ থেকে। আর এক সময় হলেতে প্রবেশ করে যাবেই, প্রজাপতি এইটা অন্ততঃ করতে পেরেছে আমাদের মধ্যে। বাংলা ছবির জন্য এটি একটি শুভ সংকেত। কারণ " পাঠান"-এর মতো করে, বাংলা ছবিতে দশ কোটি টাকা দিয়ে আইম্যাক্স ক্যামেরা ও তার ছবি তোলার জন্য ৫০ জন লোক লস্কর ও ক্রেন ভাড়া করা সম্ভব নয়। 

* সিনেমার আলোচনায় যাওয়ার আগে সিনেমার যে দুটি গান খুব জনপ্রিয় হয়েছে তা চিত্রনাট্যকে মজবুত করেছে সন্দেহ নাই। যে গানগুলি সিনেমাটিকেও জনপ্রিয়তা দিয়েছে সেই দুটি গান ব্যবহার করা হয়েছে বাবা ছেলের সম্পর্কের গভীররতা ও স্পন্দন বোঝাতে--" কতটা রাগ দেখালে রাগি/ কতটা হাসলে তুমি হ্যাপি। "গানটি গেয়েছেন অনুপম রায়। আর দর্শকদের হৃদয় ছোঁয়া গানটি গেয়েছেন, নচিকেতা। ..ভেঙে দেখো না/ জুড়ে দেখো না... তুমি আমারই আমারই রয়েছো...ওরে মন। 


* "কাউকে বলিনি কোনোদিন মুখ ফুটে/ আসলে তুমি আমার হিরো...আসলে তুমি আমার হিরো।" অনুপম রায়ের গাওয়া এই গানটি হল কাঁপিয়ে দিয়েছে একদম।

( অবশ্য প্রজাপতির সবচেয়ে দুর্দান্ত গানটি নচিকেতার গাওয়া) যেন মিঠুনের জয়গান স্বরূপ তৈরি করা হয়েছে এই গানটি। থুড়ি...আসলে গল্পাকার এখানে এক পিতার গল্প তৈরি করেছেন, এমনভাবে, যা একজন পৌঢ়কে নায়ক হিসেবে দেখতে পাই। পরিচালক এই ছবিতে একই সঙ্গে প্রজেক্ট করেছেন পিতা নামক একজন সম্পর্ককে এবং সঙ্গে সঙ্গে মিঠুন চক্রবর্তীকেও। তাই ছবির বিজ্ঞাপন প্রজেক্ট হয়েছে মিঠুনের স্টারডমকে এবং সঙ্গে বাংলা ছবির সুপারস্টার দেবকে ঘিরে। 

* কিন্তু কেউ যদি রাজনীতি ঘেঁষা হয়ে থাকেন, তবে তিনি এই গানটির দৃশ্যায়ণ পছন্দ করবেন না, যদিও এই গন্ডগোলে সাধারণ দর্শকদের কোনও পার্টিসিপেশন নেই। প্রজাপতি নিয়ে উদ্ভট ভাবনা ও আলোচনা বন্ধ

হলে বাঙালি অন্ততঃ বাঁচে। রাজনীতি বড়ই খারাপ,মন বিষয়ে দেয়, এইসব এড়িয়ে যেতে চান সকলে, কারণ প্রত্যেকে সিনেমা দেখতে বিনোদন খুঁজতে আসে। দেখা সিনেমা নিয়ে বাইরে বিরক্তিকর আলোচনা মানুষের মনকে বড় ক্ষতি করে। এইসব বন্ধ হওয়া উচিত। গন্ডগোল শুরু হয়েছে মিঠুন এখানে বিজেপি না গৌরবাবু কোন চরিত্রে অভিনয় করছেন এই রাজনৈতিক ভুল বোঝাবুঝি নিয়ে। এটা একেবারেই কাম্য নয়। 

* আসলে দর্শকদের কাছে প্রজাপতি হল এমন একটি সহজ-সরল ছবি যা বহুদিন পর হলে বসে দেখা একটি পরিচ্ছন্ন ও পরিমিত ফ্যামিলি পিকচার, যা দর্শকরা তাদের মনের তাগিদেই আকৃষ্ট হয়েছে, এর পেছনে অন্য কোনও কারণ নেই এবং উদ্দেশ্যেও নাই। এই সিনেমাটি দেখতে বসে বিজেপি-তৃণমূল-সিপিএম এইসব ফালতু আলোচনা নিয়ে মাথা ঘামালে চলবে না। তাই আসুন এই ছবি দেখতে বসে প্রথমেই রাজনীতি মুক্ত হয়েনি, তা না হলে কিন্তু এই ছবির রস আস্বাদনে আপনার-আমার কোনও ভূমিকা থাকবে না। ছবিটির কৌতুকরস কিংবা দুঃখবোধে আপনি কিছুতেই পৌঁছতে পারবেন না। আসলে এই ছবিতে কৌতুক-দুঃখবোধ এত সমান সমান বাটোয়ারা হয়েছে যে দেব ইনামূলের কাছ থেকে ৫ কোটি টাকা নিয়ে ছবিতে লগ্নি করেছেন না করেননি ওইসব ভেবে দর্শক হলে যাননি। তাই হিরণকে সতর্ক করবো, বাঙালির হৃদয়ে রাজনৈতিক ব্যাখ্যা ঢুকিয়ে তাকে বিষ করবেন না, আপনার নিজের বিষ নিজে সামলান। 


* আসলে তুমি আমার হিরো- এই গানটি দেবের সিনেমাটিকে একটি অন্যতম মাত্রা এনে দিয়েছে। সিনেমায় শুধু কেন? সমাজে বাবাদের উদ্দেশ্যে গান রচনার মতো কোনও ভাবনা ইতিমধ্যে তেমনভাবে পরিলক্ষিত হয়নি। রথীজিৎ ভট্টাচার্য সুরারোপিত প্রজাপতির গানগুলো অবশ্যই সিনেমাটিতে একটি

ন্যারেটিভ সিকোয়েন্স তৈরি করতে বা সরাসরি দর্শকদের সঙ্গে অনুঘটকের কাজ করতে সাহায্য করেছে। এইরকম মারকাটারি একটা গান তৃণমূলের সাংসদ কীভাবে যে প্রজাপতিতে রেখে দিলেন এই প্রসঙ্গেই দু-সপ্তাহজুড়ে তৃণমূলের অন্দরে মনে হয় আলোচিত হয়েছে। যদিও দেব বারংবার বলেছেন প্রজাপতি একেবারেই এক বাবা-ছেলের মায়া মমতার এসেন্সের অর্থাৎ সৌরভ সৃষ্টির গল্প। ছবিটি আসলে পিতা-পুত্রের স্নেহ-মায়া-মমতার সুগন্ধিতে ভরা। এই এসেন্স দর্শক মনে ক্যাটালিস্টের কাছ করেছে, দর্শকদের যোগাদানে তাই একটা স্বতস্ফূর্ততা দেখা গেছে এবং তারাই সিনেমাটি দেখতে অগ্রগণ্য ভূমিকা নিয়ে মাউথ ক্যাম্পেন করেছেন যার ফলে ২৩ দিন ধরে হলগুলোতে হাউসফুল বোর্ড ঝুলেছে একনাগাড়ে। 

* খ্রীষ্টমাসকে সামনে রেখে গত ২৩ ডিসেম্বর ২০২২-এ দেবের এই ছবিটি সারা ভারতজুড়ে মুক্তি পায় এবং প্রথম দিনেই এক কোটি টাকার ব্যবসা করে ফেলেছে। যার ফলে ইদানীং বাংলা সিনেমায় ব্যবসার সমস্ত রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে-প্রজাপতি, আর তাই হয়ে যায় ব্লকবাস্টার ছবি। তাই দেব এন্টারটেইনমেন্ট সংস্থা গত ১৬.০১.২০২৩-এ  সিনেমাটির সাফল্যের ২৫ তম দিন পালন করলো ফাটিয়ে, কেক কেটে। আর সেখানেই সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে মিঠুন বলেন, প্রজাপতি নিয়ে যা করা হল সেটা বাংলা সিনেমার প্রসারে অশনিসংকেত, যদিও রাজনীতিবিদরা এই কথার জন্য মিঠুনের বিস্তর সমালোচনা করেছেন। তবে সকলেই চান মিঠুন আর কুনালের এই পাল্টা দোষারোপ বন্ধ হোক। বিশেষ করে একটা সিনেমা নিয়ে এইরকম বিষ মার্কা কথাবার্তা না চালাতে দর্শককূল ব্যক্ত করেছে। রেহাই দিন দয়া করে। তবে দেব বলেছেন, সিনেমা শুরু করেছি কাউকে জবাব দেওয়ার জন্য নয়, আরও বেশি করে সকলে প্রজাপতি দেখুন। উল্লেখ্য প্রজাপতি নন্দনে জায়গা পায়নি বলে অনেকেই ক্ষুব্ধ হয়েছেন। কারণ সস্তায় ভালো ছবি দেখার জায়গা নন্দন। সবচেয়ে আশ্চর্যজনক কথা পাঠানের মতো আন্তর্জাতিক ও শাহরুখ নির্ভর সমস্ত রেকর্ড ভাঙা একটা ছবি রিলিজের তৃতীয় দিনেও প্রজাপতি সাফল্য পেয়েছে, হাউসফুল হয়েছে। 


* তবে এই ছবির নাম প্রজাপতি দেওয়া--অনৈতিক হয়েছে। তাতে সিনেমাটির সম্মাননায় আঘাত হয়েছে বলে মনে করি। খেলো করা হয়েছে। নাম হওয়া উচিত ছিল-- আসলে তুমি আমার হিরো। তবে এখন নামে কিবা এসে যায়। বাস্তবিক ছবিটি মিঠুন কেন্দ্রিক। অর্থাৎ পিতাই হল এই ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্র কিন্তু তা বলে পুত্র এখানে ফ্যালনা নয়, যেন পুত্রের কার্যক্রমের মধ্যে দিয়েই নির্লোভ, নিঃস্বার্থ, দিলখোলা, সাদামাটা পিতার চরিত্র চিত্রিত করা হয়েছে ছবিটিতে। এই ছবিতে পিতা কেন্দ্রিক চিত্রনাট্যে মিঠুন চক্রবর্তী ছাড়া আর দ্বিতীয় কাউকে কোনোভাবেই মানাতো না। পরাণ বন্দ্যোপাধ্যায় কিন্তু এই ধরনের চরিত্র করতে পারলেও দর্শকদের টানতে পারতেন না, কারণ তাঁর মধ্যে কোনও স্টারডম নেই। তাঁর মধ্যে একটা সস্তা কমেডিয়ানা গড়ে উঠেছে। যেটা প্রজাপতিতে একেবারেই প্রয়োজন নাই। মিঠুন ছাড়া এই মূহুর্তে অত বড় স্টারডম আর কারও ছিল না। আর সমস্ত ঘটনা প্রবাহিত হয়েছে হাসি আনন্দ কান্না সবকিছু ঠিকঠাক সংগ্রহের মাধ্যমে ও প্রয়োগ চাতুর্য দিয়ে--এইখানে অভীক সেন তাঁর পরিচালকের জাত চিনিয়েছেন। আরও বেশি খেটেছেন চিত্রনাট্যকার। কারণ আপনারা সম্প্রতি রিলিজ হওয়া পাঠানের সংলাপগুলো যদি শোনেন তাহলে বুঝবেন যে শাহরুখের মুখের সংলাপগুলো হলে পড়তে পায়নি, সিটি পড়ছে, আনন্দের হৈচৈ-এ ভেসে গেছে হল। তেমনি প্রজাপতির ডায়লগ হল এই ছবিকে টানটান করে রাখার একটা বিশাল সাপোর্ট সিস্টেম। সিনেমা তৈরি করার মূহুর্তে বলা হয়ে থাকে গল্প খোঁজার পর, খোঁজ করা হয় ভালো চিত্রনাট্য তৈরি করার একজন দক্ষ মানুষকে। নড়বড়ে চিত্রনাট্য নিয়ে কখনও ভালো চলচ্চিত্র তৈরি হয় না। চিত্রনাট্য কিন্তু এখানে জবরদস্ত ভূমিকা পালন করেছে। 

শোলের চিত্রনাট্যকার সেলিম-জাভেদ এই কারণে অমর হয়ে গেছেন। সুরকার এখানে তিনজন। রথীজিৎ ভট্টাচার্য, সুরজিৎ চ্যাটার্জী ও অনুপম রায়। 

* লক্ষ্য করার মতো বিষয় এই বয়স্ক মিঠুনের মুখটা এখনও সারল্যে ভরপুর। বিশেষ করে মিঠুনের স্টারডম-এর সবচেয়েও তাঁর বড় সম্পদ হল তাঁর হাসি। এখানে তাঁর এই সিরিও-কমিক চরিত্রখানি যেন মিঠুনের মতো করেই বানানো হয়েছে। মিঠুনের হাঁটাচলা থেকে শুরু করে তার অঙ্গভঙ্গিতে বয়স্কদের ছাপ আছে। জিভ বার করে মুখের মধ্যে হাত ঢুকিয়ে খাওয়ায় মিঠুনের অভিনয় লক্ষ্য করার মতো। চোখের চাউনি দিয়ে কৌতুক সৃষ্টিতে মিঠুন সিদ্ধহস্ত। তাই তাঁকে মনে হয়নি কখনও তিনি অভিনয় করেছেন। গৌরের কমিক চরিত্রটি এবং দায়িত্ববান বয়স্ক প্রেমিক চরিত্রটি পর্যন্ত তিনি অনায়াসে ফুটিয়ে তুলেছেন। মিঠুনের গৌর চরিত্রটি ছবিটিকে আগাগোড়া বরং গৌরবান্বিত করেছেন। কারণ মিঠুন চক্রবর্তীর অভিনয় জানতে হলে আপনাকে "তাহাদের কথা" জানতেই হবে। 


 • বহুদিন আগেই এলভিস প্রেসলি গুলেখাওয়া চাবুক শরীরের উপচে পড়া গ্ল্যামারের হিরোইজম্ থেকে বেরিয়ে এসেছেন তিনি। তাঁকে এইখানে আমরা পেয়ে যাই নিঃস্ব ও নিঃসঙ্গ এক ব্যতিক্রমী মিঠুন চক্রবর্তী হিসেবে যিনি শারীরিক ভাবে ভুঁড়িওলা পৌঢ় গৌর কেন্দ্রিক। হাফহাতা পাঞ্জাবির গৌর কখনও একটা পা টেনে চলেছেন, কখনও চশমা পরে কুসুমকে নিয়ে বিয়ের রেজিস্ট্রেশন করতে উপস্থিত হয়েছেন। কখনও খোঁচা খোঁচা পাকা দাড়িতে পুত্রকে লাঞ্চবক্স এগিয়ে দিচ্ছেন। মিঠুনের বডি ল্যাঙ্গুয়েজ তাই কখনও গৌর হয়ে উঠতে দেরি হয়নি। তাঁকে ছবিতে এক অবসরপ্রাপ্ত ও কর্তব্যপরায়ণ পিতার ভূমিকায় আমাদের চিনে নিতে অসুবিধা হয় না। এই ছবিতে ডিস্কোড্যান্সারের যথেষ্ট শ্লথগতি হয়েছে তবু তিনি তো মিঠুন চক্রবর্তী এবং একদম মিঠুন চক্রবর্তী যার মধ্যে বিজেপিত্ব একদম নেই। ছবিটিতে তাঁর ৩৭০- এর বেশি করা চলচ্চিত্রের সেই শরীরী ভারসাম্য আর নেই। তাই তাঁর ধীরস্থির চলাফেরা বর্তমান ছবিতে কাজ দিয়েছে। প্রৌঢ় গৌরকে গড়ে নিতে কারও তাই অসুবিধা হয়নি। কিন্তু তা বলে তাঁর সেই প্রাণচাঞ্চল্য, কৌতুক প্রবণতা কোনও ভাবে খর্ব হয়নি এতটুকু। চিত্রনাট্যের প্রয়োজনে পাড়ার হাঁটুর বয়সী ছেলেদের সঙ্গে কখনও ক্যারাম খেলেছেন, তো কখনও পাশের বাড়ির আমুদে পড়শীর সঙ্গে ( খরাজ) লুকিয়ে মদ্যপান থেকে সিগারেট ধরাতে বাদ রাখেননি। এমনকি জামাইয়ের সঙ্গেও দু-পেগ গলায় ঢেলে দিতে তাঁর আগ্রহ দেখা গেছে। তিনি যেমন পেরেছেন নেচেছেন, স্কুটার চালিয়েছেন আবার সিরিয়াস হয়েছেন প্রয়োজনে। দর্শকদের মনে ব্যাপক মনোরঞ্জন সৃষ্টিতে মিঠুন ও খরাজ এক যৌথ খোল-করতাল সঙ্গত করেছেন। মিঠুন চক্রবর্তীর মধ্যে যে একটা বহুমাত্রিক ও বহুমুখী অভিনয় প্রতিভা আছে তারই দিগদর্শন যে আবিষ্কার করে দিয়ে গিয়েছিলেন মৃণাল সেন তা আর নতুন কথা কি!? তাই ছবির সিরিও কমিক সিকোয়েন্সগুলি ব্লকব্লাস্টার মিঠুনের মতো করে গৌর তাকে হেলায় সুপার-ডুপার ড্রামায় পরিপূর্ণতা দিয়েছেন। দেবের এই ছবিতে পরিচালক ও তার টিম একই সঙ্গে দর্শকের কাছে মিঠুনকে কমেডিয়ান হিসেবেও চিনিয়ে দিতে পেরেছেন। বলতে গেলে প্রজাপতিকে দর্শকের ভালো লাগার জন্য এই ছবির ছোট ছোট কমেডি-পর্বগুলির এক প্রকার প্রবল সাপোর্ট দিয়ে ছবিটিকে অচিরেই সাকসেসফুল করেছে। খরাজ যে একজন শ্রেষ্ঠ অভিনেতা এবং রবি ঘোষ, তুলসী চক্রবর্তীর উত্তরসূরী তা তাঁর অসামান্য অভিনয়ের গুণে ক্রমাগত প্রকাশ পাচ্ছে। এখানে খরাজের অবদানও কম নয়, তিনিও একপ্রকার সাপোর্টিং হিরো। 


* পরিচালকের পরিমিতি বোধ বুঝতে আপনাকে প্রজাপতি দেখে আসার পর ভাবতে হবে। এক শ্বেতা ও দেবের ( জয়-মালা) প্রেমপর্বটি তিনি উহ্য রেখেছেন এবং এতটুকু বাড়তে দেননি এবং এই ছবিতে বিশ্বনাথ, অম্বরীশ ও খরাজ থাকায় মাত্র দুজনকে ব্যবহার করেছেন। পরিচালক এখানে যেন বিশ্ব ফুটবলের কোচ। তিনি জানেন কোন চরিত্র কোন পজিশনে, উঠে নেমে খেলবে কোন চরিত্র সাপোর্ট দেবে। একই সঙ্গে কমেডিয়ান বিশ্বনাথকে কিন্তু ব্যবহার করেননি। তাহলে ছবিটি পুরোপুরি কমেডি ফিল্ম হয়ে যেত। আর প্রেমের ছবিও করতে দিতে চাননি তাই মালা চরিত্রকে প্রথম থেকে মাঠে রেখেও লুকিয়ে রেখেছিলেন এবং যেন পেনাল্টি স্যুটটা তাকেই নিতে দিয়েছেন। মালা চরিত্র এখানে বিজয় এনে দেবে কিন্তু খেলায় আনন্দ দেবে কিন্তু অন্যরা আনন্দ দেবে। এ যেন আগের দিনের মায়েদের কুনকের মাপে ভাতের চাল নেওয়া। 


* যখন প্রথম সল্টলেকে এই ছবির স্যুটিং শুরু হয়েছিল, 

তখন দেব দ্বর্থহীন ভাষায় রাজনীতি ও চলচ্চিত্র এই দুই

বিষয়কে এক করে ফেলে তুলনা টানতে অথবা মিশিয়ে গসিপ তৈরি করতে সকলকে বারণ করেছিলেন এবং বলেছিলেন এখানে বাবা আর ছেলের একটা ভিন্ন-ধর্মী গল্প রাখা হয়েছে যা দর্শকের ভালো লাগবে। বলেছিলেন, দর্শকদের ভালো লাগানোই হল সিনেমা মেকারদের প্রধান কাজ। হুবহু বলেছিলেন-মিঠুন। তিনি বলেছিলেন, দেবের বাবার সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত সম্পর্কের কথা, মুম্বইয়ে স্টুডিওতে দেবের বাবার ক্যাটারিং থেকে 

তাদের খাওয়া আসতো। মিঠুনের বাঙালি খাবারের দিকে দেবের বাবার বিশেষ লক্ষ্য থাকতো। তাই শিশুকাল থেকেই দেব যে সিনেমার স্যুটিং, নায়ক-নায়িকা দেখে অভ্যস্ত, আর তাই দেব যে মিঠুনের মতোই আগাগোড়া সিনেমার লোক তা তো সকলের জানা উচিত। তাই দেব ও মিঠুন বাস্তবেও পিতা-পুত্রের মতো। তাই সিনেমার বাইরে যে মিঠুন-দেবের সম্পর্ক বাবা-ছেলের মতো আগে থাকতেই ছিল সেটাও বলেছেন মিঠুন, অকপটে সাংবাদিকদের কাছে। তাদের এই ছবি এক বছরের সকলের নিষ্ঠায় তৈরি হয়েছে --এই কথা

বারংবার দেব বলেছেন। আর দেবও জানে মিঠুন দা বললেও মিঠুন চক্রবর্তীর সঙ্গে তাঁর বাবা ছেলের এক মিষ্টি-মধুর সম্পর্ক লুকিয়ে আছে। এই কেমিস্ট্রি এখানে যে কাজে লেগেছে তাকেও আমাদের বুঝতে হবে। 


* এই চলচ্চিত্রে, মিঠুন চক্রবর্তী এবং দেব অধিকারী, দর্শকদের একটি হৃদয়গ্রাহী বিনোদন দিতে সমর্থ হয়েছেন। পরিচালক অভীক সেন কয়েকটি ব্যতিক্রমী প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়েছেন ছবিটির সামনে দর্শকদের। সঙ্গে সঙ্গে নিষ্ঠা দিয়ে ও যৌথভাবে একটি টিমকে নামিয়ে উত্তর দিয়েছেন সফলতার সঙ্গে। অভিজিৎ সেন সামাজিক সমস্যাগুলিকে চিহ্নিত করে পিতা-পুত্রের রসায়নে একটি পরিপূর্ণ পারিবারিক গল্প তৈরি করেছেন। যেখানে হরেক রকম মশলা থাকলেও তিনি কিন্তু তাই দিয়ে কোনও মশলাদার রিচ রান্না করেননি। সাবলীল ভাবে ছবিটি এগিয়ে গেছে তার বিনোদনের লক্ষ্যে। যে বিনোদন বাংলা ছবিতে বড় প্রয়োজন। কারণ বাংলা ছবি পাঠান দেখে আনন্দ পেলেও কখনও পাঠান করতে পারবে না। 


* গল্প: জয় (দেব) কলকাতার একজন প্রতিষ্ঠিত বিবাহ পরিকল্পনাকারী অর্থাৎ ওয়েডিং প্ল্যানার ও তার মার্কেটিং ব্যবসাদার। ছোটবেলায় সে মাকে হারিয়েছে। তার বাবা গৌর (মিঠুন চক্রবর্তী) তাকে পৃথিবীর সমস্ত ভালোবাসা দিয়ে বড় করেছেন। গৌর তার ছেলের বিয়ে দিতে চান।জয় বিয়ে করতে চায় না, কারণ এক তার কাজের ব্যস্ততা আর দুই সে ভয় করে যে তার বিয়ে হলে, সে তার বাবার কাছ থেকে দূরে সরে যেতে পারে। ঘটনাক্রমে একদিন পুরনো বান্ধবী কুসুমের (মমতা শঙ্কর) সঙ্গে গৌরের দেখা হয়ে যায়। একদিকে তিনি তার ছেলের বিয়ের সম্ভাবনা নিয়ে টেনশনে আছেন, অন্যদিকে তিনি তার ছোটবেলার বন্ধুর সান্নিধ্য পান--বিধবা কুসুমের কাছে। এদিকে কানাডায় লিভ-টুগেদার করা কুসুমের মেয়ে ছুটিতে বাড়ি এসেছে। প্রায়শই সে তার বিধবা মায়ের বিবাহের কথা বলে। 


* প্রজাপতি ছবিটা একটা ঝঞ্ঝাটহীন ও ঝগড়া ছাড়াই একটি তকতকে সিনেমার দেখা মিলেছে। ছবিটি এগিয়েছে পিতা-পুত্রের একটি অসাধারণ তরতাজা সম্পর্কের সহজাত দিক নিয়ে। ছবিটিতে হয়তো মেলোড্রামা আছে, অতি-নাটকীয়তাও আছে অর্থাৎ সিনেমার মতো করে একটি নাট্যপর্ব আছে যার ঘটনাপ্রবাহের ধারায় দর্শক ব্যাপকভাবে খুশি হয়েছে। দর্শক এই ছবির চিত্রনাট্য ও কাহিনী ধারাকে খানিকটা আপন করে নিয়ে নিজের সমাজ ও সংসারের দোটানায় আটকে পড়া দমবন্ধতাকে পুণরুদ্ধার করার চেষ্টা করেছেন। অর্থাৎ এইরকম ঘটনা বাস্তবে কখনও তাদের চারপাশে ঘটলেও কখনও তারা তা লক্ষ্য করেননি।

 

* স্ত্রী মারা গেলে, কোনও পিতা যদি কখনও বিয়ে না করেন তবে জীবনে-যুদ্ধে সেই পিতা কি কখনও পারবেন একই সঙ্গে বাবা ও মায়ের কর্তব্য পালন করতে !? কিন্তু এখানে কাহিনীতে বাড়াবাড়ি না করেও বাস্তবের মতো করে, বাবা ও ছেলের মধুর সম্পর্কের যে একটা সহজ সরল আবদার এবং দুঃখবোধ দেখা গেছে, সে কারণে এখানে পরিচালক ও চিত্রনাট্যকারের মুন্সিয়ানা 

অনস্বীকার্য। স্নেহ মায়া মমতাগুলি এখানে দর্শকদের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে মিলে মিশে চলচ্চিত্র ও দর্শকদের মধ্যে একটা দৃঢ় বন্ধন সৃষ্টি করেছে। আর তাই সিনেমা হলের প্রতিটি কোনায় চিত্রনাট্যের অন্তঃস্থলে থাকা হাসি-কান্না-মস্করাগুলি স্পন্দিত করেছে, ভাঙা-গড়ার মধ্যে দিয়ে পৌঁছে গিয়েছে জীবনের পরিপূর্ণতায়। আর সেখান থেকেই বিনোদনের দায়িত্ব গুলি অক্ষরে অক্ষরে পালিত হয়েছে এই সিনেমাটির মেকারদের তরফে। 


* তাই এই ছবিটি দেখার পর মনে হয়েছে যেন বাংলা ছবির দশকেরা ৯০-এর দশকের পারিবারিক নাটকগুলি ফিরে পেতে চাইছেন।  যেমন লাঠি, এবং শেত পাথরের থালা - যেগুলি সেই সময়ে লক্ষ লক্ষ মানুষের হৃদয় জয় করেছিল। এই ছবির সাফল্যের রসায়নে হাসি ও কান্নাকে সমান্তরাল ভাবে ভাগ করে দেওয়া হয়েছে প্রায় আধাআধি করে। হাফ টাইমের আগে যত হেসেছে দর্শক, হাফ টাইমের পর ততটাই দর্শক চুপচাপ হয়ে ক্রমশ ছবিটির রোদন পর্বের সঙ্গী হয়ে গেছে। ছবিটিতে যেমন স্নেহ, বাৎসল্য রস আছে, তেমনি আছে বয়স্ক ব্যক্তির প্রেমে পড়া সম্পর্কিত সামাজিক ভণ্ডামিকে কষাঘাত করার দৃঢ়তর প্রয়াস। এই সমাজ যাকে কলঙ্ক বলে ভাবতে শিখিয়ে ছিল, পরিচালক ও তার কাহিনী এখানে সমাজের সেইসব নেগেটিভ চিন্তাধারার দুধ কা দুধ, পানি কা পানি আলাদা করে বুঝিয়ে দেন জীবনের সৌরভ আসলে কাকে বলে।


* বর্তমান সময়ে প্রজাপতি যে একটি ইতিবাচক বার্তা দিতে সমর্থ হয়েছে তার জন্য কাহিনীর মধ্যে অবস্থিত আরও কয়েকটি ছোট ছোট উপ-কাহিনীর হৃদয়গ্রাহী

স্পন্দন পেন্ডুলাম হয়ে আমাদের মনের গোড়ার অনেকক্ষণ টিক টিক শব্দ করেছে। মূল ধারার ছবিতে যে সমসাময়িক ভাবনা দেওয়া যায়, তা এই ছবির প্রতিটি উপ-কাহিনীতে বিদ্যমান, যা মানুষের মনকে নাড়া দিয়েছে। এই ছবির কাহিনী, মূল্যবোধ ও দায়িত্ববোধগুলি ছোটো ছোটো সৌন্দর্য সৃষ্টির মাধ্যমে দর্শকদের বিনোদন দিয়েছে। সেই লগ্নে দর্শক আর সিনেমার চরিত্রের মধ্যে কোনও পার্থক্য থাকেনা। যেন দর্শকও চায় তার পুত্র এইরকম হাজার ব্যস্ততার মধ্যে তার পিতাকে সময়ে ওষুধ খাওয়ার কথা থেকে অন্যান্য বিষয়ে স্মরণ করিয়ে দিক। স্ত্রী ও মায়ের দেওয়া দুজনের টিফিন বাক্সের কোনোটাই যে একজন পুরুষের কাছে ফ্যালনা হতে পারেনা এই প্রাঞ্জল অভিব্যক্তিগুলি বড় আপন করে ছবিতে ব্যবহৃত হয়েছে। কুসুমের কাছে গৌর যেন স্যারেন্ডার করেছে শেষমেশ। গৌরাঙ্গ একদিন মমতা শঙ্করকেও তো এইরকমই বলেছিলেন তাই না?... আমার আর ঠকতে ভালো লাগে না, আমি আর একা থাকতে পছন্দ করি না। "


* ছবিটি কতগুলি ট্র্যাজিক ও কমিক এলিমেন্টককে একসঙ্গে গেঁথেছে মালার মতো করে আর সেইসব  প্রতিটি সম্ভাবনাময়  মুক্ত থেকে এক একটি ন্যারেটিভ তৈরি হয়েছে। যেমনঃ মাতৃহারা জয়। বিপত্নীক গৌর। কুসুমের বৈধব্য। মালার কাছে অবিবাহিত সুদর্শন জয় ও সম্ভাব্য প্রেমিক। গৌরের জামাইয়ের ( অম্বরীশ) মা ও স্ত্রীর মধ্যকার দ্বন্দ্ব। এছাড়াও ছবিটির মূল উদ্দেশ্য হয়েছে মানুষকে পর্যাপ্তভাবে বিনোদন দেওয়া এবং হাসানো। সাংসারিক বেদনাগুলিকে দর্শকদের দর্পণে দাঁড় করিয়ে দেওয়া। কমিকগুলিকে সিকোয়েন্স বুঝে খাইয়ে দেওয়া। সংলাপগুলিকে সমসাময়িক করা যে কারণে তৃণমূল কংগ্রেসের কয়েকটি প্রকল্পের নাম ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। গানের কথাগুলো যেন একেবারে তরতাজা হয় এবং সঙ্গীত যেন সিনেমার পর্বগুলিকে চিহ্নিত করতে পারে।


* হিন্দু ব্রাহ্মণ পরিবারের কাছে শিবের মানত রাখা বা কাশীর গঙ্গায় ডুব দিলে যে ভক্তের মনোবাঞ্ছা পূরণ হয়, এইরকম মিথগুলোকে সিকোয়েন্স তৈরিতে সাজানো হয়েছে। ভয়ভীতিতে পেয়ে বসা মানুষের মধ্যে যে অলীক কল্পনাগুলি একসময়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে যায় এবং তাকেই সমাজ ও ব্যক্তি তাঁর সম্পর্কের ধারায় প্রতিপালন করতে থাকে এবং মানুষের মনোবাঞ্ছাগুলি যতই অবৈজ্ঞানিক হোক তখন সেটাই প্রশ্রয়ে প্রশ্রয়ে বড় আকৃতির হয়ে দাঁড়ায়। ছবির মূল বিষয়বস্তুকে এই পর্বে গ্রামীণ হিন্দু মধ্যবিত্তের দর্শন দ্বারা প্রভাবিত করা হয়েছে যাতে ভ্রমণপিপাসু ধর্মভীরুদের মননকে জিতে নেওয়া যায়। হিন্দি সিনেমা যেমন ভাবে যে তাদের সিনেমায় সমস্ত ধর্মীয় আবেগকে মাথায় রাখতে হবে, কিন্তু বাংলা পরিচালনকদের সেইসব ভয়ভীতি থাকেনা। তাই বাংলা সিনেমার ভাবনা একটু অন্যরকম হয়। বাংলা ছবির আদর্শে এরকম সাজানো বিষয় তাই কোনও কালেই থাকে না। এখানে তাই বেনারসের বিখ্যাত গলির মধ্যে শিব হনুমান ও রাম সীতার সঙকে উপস্থিত করা হয়েছে জায়গার প্রতিষ্ঠানিক মাহাত্ম্য বোঝাতে। কিন্তু এইসব দেখানোর জন্য বিরূপ সমালোচনা হলেও হতে পারে, কিন্তু প্রজাপতির বিক্রিবাটা অবশ্য এইসব ছুঁতমার্গ আলোচন কখনও ছুঁতে পারেনি। অবশ্য বেনারস পর্বে গল্পের মূল কথন যেন ইচ্ছাকৃতভাবে কিছুটা সরিয়ে ফেলা হয়েছে। দর্শকদের মনের কৌতূহল ও কৌতুককে একসঙ্গে মেলাবার কারণে পিতার কাছে যেমন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠা পুজোপাঠ সর্বোচ্চ সম্মান পেয়েছে সেখানে আধুনিক ভাবনার পুত্র তার শারীরিক সক্ষমতা বোঝাতে সেখানে বেনারসের গঙ্গায় কুস্তিগিরির প্রতি জোর দিয়েছেন। এইখানে দেবের শরীর সৌষ্ঠব দেখার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে বাংলা সিনেমার ভাষার তাগিদ থেকে। মনে রাখতে হবে দেবের আগামী ছবি-" বাঘা যতীন। " 


* বাঙালির ছেলেরা শুধুমাত্র পরের কাছে চাকরি না চেয়ে যদি নিজে স্বাধীন নতুন নতুন ব্যবসার সৃষ্টি করতে পারে এবং সেই ব্যবসাকে মজবুত করতে আরও কয়েকজন বেকার কর্মযোগী ছেলেমেয়েদের নিয়ে একটা কো-অপারেটিভ রূপ দিয়ে দেবের ওয়েডিং প্ল্যানারের মতো করে এবং বাজি ধরতে পারে তাহলে সেই সংস্থাটি যেন পাবলিকের কাছে সমীহ আদায় করেও নিতে পারে । এইরকম একটা দিনবদলের কথাও এই ছবির চিত্রনাট্যকার ভেবেছেন বলেই মনে হয়েছে। আর সেখানে এমন এক নিরাপত্তা যদি দেওয়া যায় যাতে একটি মেয়ে সাতবার ভাবে সে আরও ভালো পরিকাঠামো যুক্ত নতুন চাকরিতে চলে যাবে কিনা? অথবা এখানেই থেকে যাবে। যদিও এই পর্বে যে একটি প্রেমের আখ্যান ছিল, যাকে পরিচালক দৃঢ়তায় ছেঁটে ফেলেছেন, যেখানে একটা সমান্তরাল প্রেমের গল্প মুখ্য হতে পারতো, কিন্তু পিতা-পুত্রের গল্পের তাতে ধার কমে যেতে পারতো। মালা রূপী স্বেতা ভট্টাচার্যের চরিত্র ছবির প্রয়োজনে এখানে মার খেলেও, সেই অব্যক্ত প্রেমেরও সফল পরিণতি দর্শক চাহিদায় পরিপূর্ণতা পেয়েছে মাত্র দুটি দুমিনিটের সিকোয়েন্স রচনায়। একটি ডায়রির মধ্যে জয়ের ছবি আর দ্বিতীয়টি হল মালা-র দুই গালে জয় কেকের ক্রিম দিয়ে তার আদরের আঙুল এঁকে দিচ্ছে নাকি আদর আঁকছে জয়?! 


* ওয়েডিং প্ল্যানার জয়ের ম্যানেজমেন্ট হাউস দ্বারা পরিচালিত এক বিয়ে বাড়ির প্রাঙ্গণে আমরা ছবির শুরুতেই প্রবেশ করে যাই যখন, তখন স্ক্রিনের একদিকে ছবির কাস্টিং বিজ্ঞাপিত হচ্ছে। আর অন্য দিকে চলছে

লুচি, ফিস ফ্রাই ভাজা, বড় বড় কড়াই জুড়ে। একদিকে জিলিপিও তৈরি হচ্ছে আর ছবির টাইটেল সঙের ছন্দময় জাদুতে আমাদের মনোজগত গুন গুনিয়ে ওঠে, "যে প্রজাপতির উড়ে যায়/ তার মতি গতি বাপু বোঝা দায়। "


* প্রজাপতির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য গানটি গেয়েছেন

নচিকেতা। " তোমারই সাথে চলতে শিখেছি/তোমারই হাতে জীবন আমার... তোমার কাছেই ফিরবো আবার/ ওরে মন /অভিমান/পিছুটান... ভেঙে দেখো না/ জুড়ে দেখো না... তুমি আমারই আমারই রয়েছো...ওরে মন বলি শোন / তোমার জন্য আর কত রাত...। সমস্ত দরদ উথলে এই গানটি নচিকেতা গেয়েছেন এবং প্রজাপতিতে বাবা-ছেলের ভুল বোঝাবুঝিতে যে কষ্টের উৎপত্তি হয়ে ছিল। যে বেদনার মধ্যে দিয়ে পিতা-পুত্রের মনোবেদনার সঙ্গীত বেজে ওঠেছিল তা প্রতিফলিত হয় এই একটি গানের মধ্যে দিয়ে। গানটি এক অনন্য স্কেলে ও গায়কিতে বেঁধে দেন নচিকেতা যা ছবিটির প্রাণভোমরা হয়ে ওঠে অচিরেই। ধীরে ধীরে এই একটা গানের মধ্যে দিয়ে আমরা দেব ও মিঠুনের অভিনয় ক্ষমতা ও বাবা ছেলের মধ্যেকার করুন কোমল রসের আস্বাদন পাই ও তাদের দুজনের তারিফ না করে পেরে উঠি না। 


* প্রজাপতিতে, মিঠুন চক্রবর্তী এবং দেব অধিকারী একটি হৃদয়গ্রাহী বিনোদন দিতে সমর্থ হয়েছেন। সঙ্গে সঙ্গে পরিচালক কয়েকটি ব্যতিক্রমী প্রশ্নের সম্মুখীন করেছেন এবং সেগুলো সামগ্রিক নিষ্ঠা দিয়ে সফলভাবে তার উত্তর দিয়েছেন। অভিজিৎ সেন সামাজিক সমস্যাগুলিকে চিহ্নিত করে পিতা-পুত্রের রসায়নে একটি পরিপূর্ণ পারিবারিক গল্প তৈরি করেছেন। যেখানে প্রযোজকের সম্পূর্ণ সাপোর্ট পেয়েছেন। সবচেয়ে কারিগরি দক্ষতা অভীক সেনের তাঁর চিত্রনাট্য রচনা। 


* গল্প: জয় (দেব) কলকাতার একজন প্রতিষ্ঠিত বিবাহ পরিকল্পনাকারী অর্থাৎ ওয়েডিং প্ল্যানার ও তার মার্কেটিং ব্যবসাদার। ছোটবেলায় সে মাকে হারিয়েছেন। তার বাবা গৌর (মিঠুন চক্রবর্তী) তাকে পৃথিবীর সমস্ত ভালোবাসা দিয়ে বড় করেছেন। গৌর চান তার ছেলের বিয়ে হোক।জয় বিয়ে করতে চায় না কারণ সে ভয় করে যে তার বিয়ে হলে সে তার বাবার কাছ থেকে দূরে সরে যেতে পারে। একদিন গৌর ঘটনাক্রমে তার বাল্যবন্ধু কুসুমের (মমতা শঙ্কর) সাথে দেখা হয়। একদিকে তিনি তার ছেলের বিয়ের সম্ভাবনা নিয়ে টেনশনে আছেন, অন্যদিকে তিনি তার ছোটবেলার বন্ধুদের সান্নিধ্য পান

কুসুমের কাছে। এদিকে কানাডায় লিভ-টুগেদার করা কুসুমের মেয়ে ছুটিতে এসে, প্রায়শই তার বিধবা মায়ের বিবাহের কথা বলে। 


* প্রজাপতি ছবিটা একটা ঝঞ্ঝাটহীন ও ঝগড়া ছাড়াই একটি তকতকে সিনেমা। ছবিটি এগিয়েছে পিতা-পুত্রের

একটি অসাধারণ তরতাজা সম্পর্কের সহজাত দিক নিয়ে। ছবিটিতে হয়তো মেলোড্রামা আছে, অতি-নাটকীয়তাও আছে অর্থাৎ সিনেমার মতো করে একটি নাট্যপর্ব আছে যার কোথাও না কোথাও দর্শক খুশি হয়েছে। দর্শক এই ছবির চিত্রনাট্য ও কাহিনী ধারাকে খানিকটা আপন করে নিয়ে নিজের সমাজ ও সংসারের দোটানায় আটকে পড়া দমবন্ধতাকে পুণরুদ্ধার করেছেন। অর্থাৎ এইরকম ঘটনা বাস্তবে কখনও ঘটেছে। স্ত্রী মরে গেলে পিতা যদি কখনও বিয়ে না করেন তবে জীবনে-যুদ্ধে সেই পিতা কি কখনও পারবেন একই সঙ্গে বাবা ও মায়ের কর্তব্য পালন করতে !? কিন্তু এখানে কাহিনীতে বাড়াবাড়ি না করেও দেবের প্রোডাকশন, সম্পর্কের মাত্রায় বাবা ও ছেলের মধ্যে পরস্পরকে ভালোবাসার একটা সহজ সরল বার্তা সারা হলময় ছড়িয়ে দিতে পেরেছেন এবং মিঠুনের  গৌর চরিত্রটি ছবিটিকে আগাগোড়া গৌরবান্বিত করেছেন। 


* এলভিস প্রেসলি গুলে খাওয়া চাবুক শরীরের উপচে পড়া গ্ল্যামারের হিরো ইজম্ থেকে বেরিয়ে এসে তাকে এইখানে পেয়ে যাই নিঃস্ব ও নিঃসঙ্গ এক ব্যতিক্রমী মিঠুন চক্রবর্তীকে যিনি ছবিতে ধরা দিয়েছেন অবসরপ্রাপ্ত এক কর্তব্যপরায়ণ পিতার ভূমিকায়। ডিস্কোড্যান্সারের যথেষ্ট ভুঁড়ি এখন। ছবিটিতে সেই শরীরী ভারসাম্য কাজ দিয়েছে প্রৌঢ় গৌর কে গড়ে নিতে। কিন্তু তা বলে তাঁর সেই প্রাণচাঞ্চল্য কোনও ভাবে খর্ব হয়নি এখানে। চিত্রনাট্যের প্রয়োজনে পাড়ার হাঁটুর বয়সী ছেলেদের সঙ্গে কখনও ক্যারাম খেলেছেন তো কখনও পাশের বাড়ির আমুদে পড়শীর সঙ্গে ( খরাজ) লুকিয়ে মদ্যপান থেকে সিগারেট ধরাতে বাদ রাখেননি। এই বয়সে তাঁর ওইসব নেশা করা যদিও মানায় না। আর ছবির এই পর্বটি তাই দর্শকদের ব্যাপক মনোরঞ্জন সৃষ্টিতে মিঠুন ও খরাজ এক যৌথ খোল-করতাল সঙ্গত করেছেন। মিঠুন চক্রবর্তীর মধ্যে যে একটা বহুমাত্রিক ও বহুমুখী অভিনয় প্রতিভা আছে তারই দিগদর্শন যে আবিষ্কার করে দিয়ে গেছেন মৃণাল সেন তা আর কে না জানেন। তাই ছবির সিরিও কমিক সিকোয়েন্সগুলি আর এক ব্লগব্লাস্টার চরিত্রাভিনেতা খরাজের সহযোগিতায় মিঠুন তাকে হেলায় সুপার-ডুপার ড্রামার পরিপূর্ণতায় ভরিয়ে দিয়েছেন। দেবের এই ছবিতে পরিচালক ও তার টিম একই সঙ্গে দর্শকের কাছে মিঠুনকে কমেডিয়ান হিসেবেও চিনিয়ে দিতে পেরেছেন। বলতে গেলে প্রজাপতিকে দর্শকের ভালো লাগার জন্য এই ছবির ছোট ছোট কমেডি-পর্বগুলির সাপোর্ট ছবিটিকে অচিরেই সাকসেসফুল করে অজস্র ছক্কা হাঁকানো 

একটি সিনেমা বানাতে সক্ষম হয়েছে। 


* তাই এই ছবিটি দেখার পর মনে হয়েছে যেন বাংলা ছবির দশকেরা ৯০-এর দশকের পারিবারিক নাটকগুলি ফিরে পেতে চাইছেন।  যেমন লাঠি, এবং শেত পাথরের থালা - যেগুলি সেই সময়ে লক্ষ লক্ষ মানুষের হৃদয় জয় করেছিল। এই ছবির সাফল্যের রসায়নে হাসি ও কান্নাকে সমান্তরাল ভাবে ভাগ করে দেওয়া হয়েছে। হাফ টাইমের আগে যত হেসেছে দর্শক, হাফ টাইমের পর

ততটাই দর্শক চুপচাপ হয়ে ক্রমশ ছবিটির রোদন পর্বের সঙ্গী হয়েছে। ছবিটিতে যেমন স্নেহ, বাৎসল্য রস আছে। তেমনি আছে বয়স্ক ব্যক্তিদের প্রেমে পড়া সম্পর্কিত সামাজিক ভণ্ডামিকে কষাঘাতে করার দৃঢ়তর প্রয়াস। এই সমাজ যাকে কলঙ্ক ভাবতে শিখিয়ে ছিল, পরিচালক ও তার কাহিনী এখানে সমাজের সেইসব নেগেটিভ চিন্তাধারার দুধ কা দুধ পানি কা পানি আলাদা করে বুঝিয়ে দেন জীবনের সৌরভ আসলে কাকে বলে।


* বর্তমান সময়ে প্রজাপতি যে একটি ইতিবাচক বার্তা দিতে সমর্থ হয়েছে তার জন্য কাহিনীর মধ্যে অবস্থিত আরও কয়েকটি ছোট ছোট উপ-কাহিনীর হৃদয়গ্রাহী

স্পন্দন। মূল ধারার ছবিতে যে সমসাময়িক ভাবনা দেওয়া যায় তা এই ছবির প্রতিটি উপ-কাহিনীতে বিদ্যমান, যা মানুষের মনকে নাড়া দেয়। এই ছবির কাহিনী এখানে মূল্যবোধ ও দায়িত্ববোধ গুলি যখন ছোটো ছোটো সৌন্দর্য সৃষ্টির মাধ্যমে দর্শককে বিনোদন দেয় তখন দর্শক আর সিনেমার চরিত্রের মধ্যে কোনও পার্থক্য থাকেনা। যেন দর্শকও চায় তার পুত্র এইরকম হাজার ব্যস্ততার মধ্যে তার পিতাকে সময়ে ওষুধ খাওয়ার অন্যান্য বিষয়ে সতর্ক করে। স্ত্রী ও মায়ের দুজনের টিফিন বাক্সের কোনোটাই যে একজন পুরুষের কাছে ফ্যালনা হতে পারেনা এই প্রাঞ্জল অভিব্যক্তিগুলি

বড় আপনার মনে হয়। 


* বাঙালির ছেলেরা শুধুমাত্র পরের কাছে চাকরি না চেয়ে যদি নিজে স্বাধীন নতুন নতুন ব্যবসার সৃষ্টি করতে পারে এবং সেই ব্যবসাকে মজবুত করতে আরও কয়েকজন বেকার কর্মযোগী ছেলেমেয়েদের নিয়ে একটা কো-অপারেটিভ রূপ দিয়ে দেবের ওয়েডিং প্ল্যানারের মতো করে বাজি ধরতে পারে এবং সেই সংস্থা টি যেন পাবলিকের কাছে সমীহ আদায় করে নিতে পারে । এইরকম একটা দিনবদলের কথাও এই ছবির চিত্রনাট্যকার ভেবেছেন বলেই মনে হয়েছে। আর সেখানে এমন এক নিরাপত্তা দেওয়া যায় যাতে একটি মেয়ে সাতবার ভাবে সে আরও ভালো পরিকাঠামো যুক্ত নতুন চাকরিতে চলে যাবে কিনা? অথবা এখানেই থেকে যাবে। যদিও এই পর্ব পরিচালক দৃঢ়তায় ছেঁটে ফেলেছেন, যেখানে একটা সমান্তরাল প্রেমের গল্প মুখ্য হতে পারতো। স্বেতা ভট্টাচার্যের চরিত্র ছবির দৈর্ঘ্যতার জন্য এখানে মার খেলেও সেই অব্যক্ত প্রেমেরও সফল পরিণতি দর্শক চাহিদায় পরিপূর্ণতা পেয়েছে। 


* কিন্তু প্রজাপতি যখন করছেন মিঠুন তখন তিনি ৩৭০ খানা ছবি করে ফেলা এক পৌঢ়। কিন্তু দম কমে নি এতটুকু। সিনেমাটার আগে গিয়েছিলেন হসপিটালে।ফিরে এসেছেন যেন বীর বিক্রমে। প্রজাপতির মিঠুন-খরাজ পর্ব চলে যান সরাসরি। সবচেয়ে প্রাণবন্ত এই পর্বে কি কি ডায়লগ আপনি লক্ষ্য করেছেন? একদম হাল আমলে তৃণমূলের কিছু জনহিতৈষী প্রোগ্রামের ব্র্যান্ড নেম ডায়লগে প্রবেশ করানো হয়েছে। দর্শক এইসব নামের সঙ্গে এতখানি পরিচিত যে তার কিসে মনোরঞ্জন হবে তা চিত্রনাট্যকার সর্বোত্তম ভাবে তা জানতেন। আপনি জানেন মিঠুন ও খরাজের সেই কথোপকথন। "একটা ঘরোয়া মেয়ে দরকার। খরাজ এর নাম দিয়েছেন যোজনা-৭৩। মিঠুন জানতে চান, আগে বল তো। খরাজ: নাম রূপশ্রী, কন্যাশ্রীর অ্যাকাউন্ট আছে, স্বাস্থ্য সাথী কার্ড আছে, বাবার মুদির দোকান আছে। মিঠুন: এত সাথী দিয়ে আমার ছেলেটাকে সাথী হারা করিসনি রে। আমার ছেলের একটা জীবন সাথী দরকার। ব্যস সিরিয়াস কথাবার্তায় হলে উঠেছে হাস্যরোল। 


* ছবিটি যত শেষের দিকে যেতে থাকে ততই চিত্রনাট্য জুড়ে করুণ রসের সঞ্চার হতে থাকে। তাই কখনও মিঠুন তার পুরনো প্রেমিকা মমতা শংকরকে যেন ১৯৭৮ সালে যেমন বলেছিলেন, " আমি যদি ভুল করেও তোকে ফোন করি না, তুই তুলসি না। " হুবহু সেই একই প্রসঙ্গ হুবহু যেন সেই একই ঘটনার পুণরাবৃত্তি হতে থাকে প্রজাপতি-র শেষে এসে। মমতা-মিঠুন প্রেমের সেই জীবন রস। ধীরে ধীরে জয়ও যেন ( দেব) বুঝতে পারে তার কোথাও ভুল হয়ে যাচ্ছে। বিয়ে বাড়িতে অন্য পুরুষরা যখন গৌরবাবুর বিয়ে করা নিয়ে খেউড় করতে থাকেন তখন পুত্র জয় নিমেষেই তার ভ্রান্ত ধারণা বিসর্জন দিয়ে, বাবার পক্ষ নেয়, সকলকে অবাক করে দিয়ে বলে, " আমার বাবা বিয়ে করছে। বেশ করছে। " সমাজে এত দিনকার বহন করে আসা ঘোলা জলের কলে তখন পরিষ্কার পানীয় জলের ধারা বইতে শুরু করেছে। পরিচালক, চিত্রনাট্যকারের কাছে পায়রা ওড়ানো হাততালির শব্দ পৌঁছে যায়। দর্শনীয় হয়ে ওঠে বাবা-ছেলের কথোপকথন থেকে প্রতিবাদ। পুত্রের হৃদয়স্পর্শী কাতরতায় দর্শক যেন তাঁর নিজের পুত্রকেই খুঁজে পায়। পরে একসময় দেব অর্থাৎ জয় কান্না ঝরা কন্ঠে বলে, তোমাকে ছাড়া থাকতে পারবো না। বহুমাত্রিক এক সম্পর্কের ভিত্তিভূমি যেন সত্য-সত্যই ফিরে আসে। বাঙালির প্রতিটি পরিবারের আর্তি যেন জড় হতে থাকে। দর্শক যেন উপলব্ধি করে তাদের পরিবার যেন আবার জোড় লাগতে শুরু করেছে। সমাজকে একটি বৃহত্তর মেসেজ দেওয়ার ছবি প্রজাপতি ততক্ষণে সমাপ্ত হয়েছে। কেউ অশ্রমগ্ন, কেউ হল থেকে উঠতে চান না। ততক্ষণে শুরু হয়েছে প্রজাপতির মেকিং পর্ব। এক্সিটের লাল আলো জ্বলে গেছে সার হল তখন থমথম করছে। কেউ কারও মুখে তাকাচ্ছে না। কিছুক্ষণ হলেও যেন সকলে একটা ঘোরের মধ্যে এতক্ষণ ছিল যেখানে, সেখানে একই ছাদের নীচে স্বামী-স্ত্রী-মাকে নিয়ে দুটি সংসারের বিবাদ-কষ্ট ছিল তা এই ছবি যেন মিটিয়ে দিয়েছে। মিটিয়ে দিতে না পারলেও একটি দিগদর্শন দিয়েছে সেটাই বা কম কি। 


* প্রজাপতিতে কটা গল্প আছে? একটা গল্প পিতা-পুত্রের। একটা গল্প মা-পুত্রের। আর একটা গল্প মা-মেয়ের। আর একটা গল্প পুত্রের অফিসিয়াল কাজকর্ম ও প্রেম। এই চারটি পর্ব আছে এই ছবিতে। তার মধ্যে মুখ্য পর্ব পিতা পুত্রের গল্প। যেখানে দেব ও মিঠুনের অভিনয় দর্শকদের মন ছুঁয়ে গেছে। মিঠুনের সমস্ত গ্ল্যামার এখানে তাকে এই প্রথম পরিত্যাগ করতে যে হল এমনটা নয়। তাহাদের কথায় আমরা মিঠুনের প্রজ্ঞা, পঞ্চাশ ঊর্ধ্বতন এক জেলখাটা প্রাক্তন স্বাধীনতা সংগ্রামীর মতো কঠিন চরিত্রে অভিনয় করতে দেখেছি। একেবারে গাঁয়ের মাটি মাখা মানুষের সেই চরিত্র বাঙালি দর্শক ভুলে আজও যায়নি। মিঠুনের অভিনয় দক্ষিতাকে ছোট করতে মুম্বাইয়ের বাঘা বাঘা পরিচালকরা দেওয়াল হয়ে দাঁড়িয়ে গেছেন। ফিল্মফেয়ার অ্যাওয়ার্ড অনেকবার হাত ছাড়া হয়েছে তাঁর। অমিতাভ বচ্চন, এই দুজনের পর ক্যারেক্টর রোলে মিঠুন চক্রবর্তীর প্রয়োজন যে ফুরিয়ে যায়নি তা কিন্তু দেব নিজে স্বীকার করেছেন এবং বুঝতে পেরেছেন। তবু মিঠুন চক্রবর্তীকে নিয়ে প্রজাপতির সমালোচনা যত হয়েছে তাঁর দশগুণ মানুষ এই সিনেমাটিকে দেখে আনন্দ পেয়েছে। প্রজাপতির সবচেয়ে বড় অবদান সেটি হল সমাজ জোড়ার গল্প বলা হয়েছে এখানে। প্রজাপতির গল্পে কখনও ভিলেনের দেখা মেলেনি। প্রতিটি গল্পের মাত্রা কিন্তু আলাদা তবু পরিচালক, এডিটর, ক্যামেরাম্যান, কলাকুশলীরা দলবেঁধে কাজ করেছেন এমন যাতে দর্শক যেন প্রতিটি দৃশ্যকে বুঝে নিতে পারেন এবং সঙ্গে সঙ্গে হলের মধ্যে রিঅ্যাক্ট করেন। তাই হাফ টাইম পর্যন্ত মিনিটে মিনিটে দর্শক হেসে গড়াগড়ি খেয়েছেন, হেসেছেন, মতামত ব্যক্ত করেছেন, মন থেকে ছোট ছোট অরিগামির কাগজের প্লেনকে উড়িয়ে দিয়েছেন। কখনও দর্শক নিজের হাঁটুতে চাপ্পড় মেরেছেন। উথলে উঠেছেন। সেই দর্শক স্তব্ধ হয়েছেন, নির্বাক হয়ে মিঠুনের অভিনয় উপলব্ধি করেছেন। খরাজের অবদান যে বাংলা সিনেমায় কতখানি প্রবল তা তিনি মারকাটারি অভিনয়ে তা বুঝিয়ে দিতে পেরেছেন। এত সাবলীল ভাবে মিঠুন মমতা শংকর পর্ব, দেব পর্ব, খরাজ পর্ব ম্যানেজ করেছেন যে কারণে বিএফজেএ পুরস্কারের অঞ্জলি মিঠুনকে না দিয়ে উপায় ছিল না। এটা সকলের জানা নেই সুপার স্টাররা যখন তাঁর ইমেজ ভেঙে, সমস্ত গ্ল্যামার বিসর্জন দিয়ে সাধারণ পি-থ্রি উত্তমকুমার হাফ হাতা গেঞ্জি পরে, পাকা চুল দাড়ি দেখিয়ে অভিনয়ে রাজি হন কোনও কমার্সিয়াল ফিল্মে কাজ করতে তখন

তারা বেশি টাকা ডিমান্ড করেন। কিন্তু বাস্তবে মিঠুনের সঙ্গে দেবের এত মিষ্টি-মধুর সম্পর্ক যে মনে হয় মিঠুন প্রাপ্য নিলেও অতিরিক্ত কিছু নেননি। আর মিঠুন যেভাবে অভিনয়ের সঙ্গে পা নাচিয়েছেন, জিভ বার করে বুড়ো মানুষের মতো ভাত মেখে খেয়েছেন, তা সত্য সত্যই মধ্যবিত্ত বাঙালির পৌঢ়তাকে আমরা সহজে মনে গেঁথে নিতে পারি। দেবও যে ভীষণ খেটেছেন এবং মিঠুনের এত দিনকার অভিজ্ঞতাকেও কাজে লাগিয়েছেন তাও এই ছবির একটি বড় বিষয়। যে লোকটি ৩০০ ছাপিয়ে সিনেমা করেছেন, ফিল্ম মেকিং-এ তার অভিজ্ঞতা বড় কম নয়। বিশেষ করে মুম্বাই ফিল্মি কারগরি ও নাট্য মূহুর্তগুলিকে কীভাবে কম্পোজ করতে হয় মিঠুন সঙ্গে থাকলে সেটা যে কত সহজ হয় দেব নিশ্চিত সেকথা জানতেন। সিনেমা মানে যে শুধুমাত্র একটা হড় হড় করে গল্প বলে যাওয়া তা তো নয়। নবীন ফটোগ্রাফার, নবীন সেট-সেটারদের যে মিঠুন কতবড় একটা অভয়রূপে উপস্থিত থেকেছেন সেটাও হয়তো অনেকেই ভাবতে পারবেন না। এছাড়াও তো রয়েছে আলো, ক্যামেরার কারসাজি থেকে কাট এবং সংযোজনে- মিঠুনকে নেওয়ায় অনেকটা সফলতা পেয়েছে। সবেতেই মিঠুনকে, দেব পিতার মতো পেয়েছেন বলেই মিঠুনের অপমান দেব আগ বাড়িয়ে এগিয়ে এসে ব্যটে বলে খেলেছেন এবং প্রতিটি শট ওভার বাউন্ডারি করেছেন। এতো গেল প্রজাপতির বাইরের সমালোচনার দিক। 


* প্রজাপতির এই পৌঢ় মিঠুন কিন্তু সেই ফুল ঔর অঙ্গারের মিঠুন নয়, যেখানে মিঠুন পৌঁছে গেছেন তখন ডান্স ডান্স করার পর,ইনকাম ট্যাক্সের হাইয়েস্ট পেডারের ভূমিকায়। ঝাড়পিট করে খতম করছেন গুন্ডাদলকে, সঙ্গে সুন্দরী দক্ষিণী নায়িকার সঙ্গে চুকিয়ে সিনেমাটিক প্রেম। 


* মিঠুনের সিনেমার নামই তো "দাদাগিরি" ছিল। তাই তার দাদাগিরি সমানে পিতার মত ছবির মধ্যে ও ছবির বাইরে আগ্রহের সঙ্গে ছিল বলেই কখনও ছবিটির কোনও পর্ব মার খায়নি। আসলে তো দর্শকের মনোরঞ্জন করাই হল সিনেমার আদি ও একমাত্র উদ্দেশ্য। সেই উদ্দেশ্য দেবের সফল হয়েছে। পরিচালক এত মার্জিত ভাবে বসের সঙ্গে তার অধস্তনের প্রেমপর্বটি তৈরি করেছেন যা একটা মাত্র সিকোয়েন্স উন্মোচিত হয়েছে এবং দর্শক যেন ওই মূহুর্তটুকুকে কিছুতেই মিস করতে চাননি। অতিরিক্ত মেদ যে শরীরের পক্ষে যেমন খারাপ অতিরিক্ত ডায়লগ তেমনি সিনেমার পক্ষে খারাপ। এই দুটোই বুঝতে পারি দ্য বাইসাইকেল থিভস্ থেকে পথের পাঁচালীতে। যদিও অতিরিক্ত ডায়লগ থেকেও সোলে তার নিজস্বতা ও মৌলিকত্বের বিচারে অনন্য হয়ে আছে। সে যাই হোক। শুধুমাত্র প্রজাপতি সামান্য হোঁচট খেল শেষ দৃশ্যে গিয়ে অতিরিক্ত ডায়লগ ব্যবহার করতে পরিচালক বাধ্য হলেন ছবিটিকে ওইখানে শেষ করতে। তবুও এইটুকু মেদ প্রজাপতির জন্য দর্শকরা অম্লানচিত্তে মেনে নিয়েছেন এবং প্রথম দিনে সারা ভারতে এক কোটি টাকার ব্যবসা করেছে। এই মূহুর্তে ব্লকব্লাস্টার হয়ে রয়েছে প্রজাপতির বিক্রির জন্য। এই সময়ে বাংলা ছবির জনপ্রিয় এবং ভালো ছবির সুপারস্টার হিসেবে দেবের সঙ্গে দৌড়ে সকলেই পেছনে থাকবেন। কমলেশ্বর  গঙ্গোপাধ্যায়ের চাঁদের পাহাড় সহ অন্যান্য ছবিতে দেবের জনপ্রিয়তা, অভিনয়, শরীর সৌন্দর্য আমাদের মুগ্ধ করেছে কিন্তু প্রজাপতি, টনিক দেবের নিজের ছবি। নিজের সর্বোচ্চ দেওয়ার ছবি। তাই প্রজাপতিতেও দেব ছাড়া পুত্রের এই চরিত্রে আর কাউকে মানাতোই না। বাংলা দর্শক বুঝেছে চাঁদের পাহাড় কিংবা প্রজাপতি দুটো ভিন্ন ধর্মীয় ছবি হলেও দুটোতেই দেবের অসাধারণ প্রজ্ঞা, অভিনয় ও নায়ক হয়ে ওঠার পর্বগুলো একদম মৌলিক। যদিও প্রজাপতি নামটি বড় বেমানান ঠেলে তা ভাসিয়ে নিয়ে গেল ২০২২-২৩ কে। না প্রজাপতি আসলে একজন পিতার গল্প। যাঁর আত্মত্যাগ বাবু কালচার থেকে বর্তমান পর্যন্ত ভারতীয় সমাজে বিরল। পুরুষদের দ্বিতীয় বিবাহের চিরাচরিত ধারাকে যেমন কষাঘাৎ করেছে তেমনি এই ছবি নারীর দ্বিতীয় বিবাহের প্রয়োজনের কথা দ্বর্থহীন ভাবে শুনিয়ে গেছে। তাই বিবেক হিসেবে দেবের পরিচালক ও কাহিনীকার ছবিতে উপস্থিত করেছেন বিদেশে লিভটুগেদার করা একজন তরুণীকে। যে ভারতীয়দের কাছে এই বাণী পৌঁছতে কানাডা থেকে এসে উপস্থিত হয়েছে। 


* এই বর্তমানে এসে আমরা কমবেশি তিনটি গল্পের সঙ্গে বাস্তবে পরিচিত হয়েছি। মা-মেয়ের গল্পটি চালু এদেশের পক্ষে বিপক্ষে যায়, তবুও হয়নি তাতো নয়, হয়েছে। বরং বলা যায় বাবার বিয়ে এদেশের কালচার। কিন্তু পরিচালক এই ছবিতে ব্যতিক্রমী গল্পগুলো এনেছেন। 

আর একটি প্রধান বিষয় হল, দেবের টিম এখানে গোয়া বাগানের গৌরাঙ্গ চক্রবর্তীকে রেখেছেন বাবা হিসেবে। আদতে নাকি বাস্তবে মুম্বাইয়ে মিঠুন দেবের পিতার সঙ্গে কাজ করেছেন এবং এখনও দুজনের মধ্যে বাবা ছেলের সম্পর্ক। দেবের টিম আর একটি নস্টালজিক প্রেমপর্ব এখানে রেখেছেন, যা খানিকটা বাস্তবে একদিন সত্যি বলে সকলে ধরে নিয়েছিল। দেব মমতা শংকরকে রাজি করিয়ে পুরনো গসিপের খোঁজে আমাদের একটা পুণরুদ্ধার প্রেমের ফ্রেমে নিয়ে গেলেন। মায়ের বিয়ে, মা-পুত্র ও স্ত্রীর দোটানা, বাবার আত্মত্যাগে একটি ছেলের বড় হয়ে ওঠা এবং এই তিনটি গল্পের পাশাপাশি আরও একটি নির্ভেজাল মিষ্টি প্রেমের ছোঁয়ায় মধ্যে যে একটা নিটোল সিনেমা-গল্প বা সরল একটি নাটক নামানো হয়েছে 


* প্রজাপতি সিনেমার একটা পার্ট শাশুড়ি বৌমার মধ্যে একটা দূরত্বের গল্প যা বলা হয়েছিল শেষ পর্যন্ত তাকে পরিচালক একটা জয়েন্ট ফ্যামিলি হিসেবে গড়ে তোলার আহ্বানের গল্পতে নিয়ে গেলেন। সিনেমায় বৌমা থাকেন তিন তলায় আর মা থাকেন এক তলায়। ছেলে অফিস যাবার সময় বৌমাও তিন তলা থেকে যেমন টিফিন করে দেয় আর মাও সমানভাবে টিফিন তুলে দেন এক তলায় দাঁড়িয়ে। মৌরলা মাছের প্রিপারেশন ছেলে যেহেতু ভালোবাসে। কেউ কেউ দেখলাম বাবা ছেলের সিনেমা দেখতে গিয়ে এই শাশুড়ি-বৌমার কাহিনীটি মুখ্য করে ফেলে দশ কথা ফেসবুকে লিখেছেন। কিন্তু তাদের বোঝা উচিত। যুগটা এতটাই এগিয়ে গেছে যার ফলে শাশুড়ি-বৌমার মধ্যে বিস্তর ফারাক দেখা দিয়েছে। এই একতলায় তিনতলায় একসঙ্গে থাকাটা খারাপ কিছু নয়। বরং বৌমার এইরকম থাকায় দায়িত্ব বেশি হওয়া উচিত পরিচালক শেষ পর্যন্ত তাই বৌমাকেই তার ভুল বুঝতে পারার ইঙ্গিত দিয়েছেন। 


* চরিত্রেঃ- মিঠুন চক্রবর্তী, মমতা শঙ্কর, দেব অধিকারী, খরাজ মুখার্জী, কনিনীকা ব্যানার্জী, অম্বরীশ ভট্টাচার্য, বিশ্বনাথ বসু, কৌশানী মুখার্জী, বিশ্বনাথ এবং শ্বেতা ভট্টাচার্য ( সাপোর্টিং হিরোইন)। 


* বাংলাদেশের টিভিতে রিপোর্টার শাহরিয়া রহমান মিঠুনের ভূয়সী প্রশংসা করলেন। প্রজাপতিকে কেন্দ্র করে পশ্চিমবঙ্গে যে রাজনৈতিক টিকা-টিপ্পনি চলছে সে খবরও তারা রেখেছেন। প্রজাপতি তারাও দেখতে চান তাই সেখানেও কৌতূহলের শেষ নেই। সব শেষে বলি প্রজাপতি যেন তার অমোঘ প্রতিশ্রুতি পালনে নিজেকে উজাড় করে দিয়েছে। হাজার রকম নকল থেকে তৈরি হওয়া প্রচারের বন্যায় আলোড়িত কপিপেস্ট ছবি পাঠান ঝড়ে প্রজাপতি উড়ে যায়নি এখনও। কদিন আগেই হাউসফুল হয়েছে একসঙ্গে সবকটি হলে। 


কপিরাইট লেখা: কেউ এখান থেকে টুকরো না। লেখাটি দীর্ঘ হল এবং মুক্তির ৪২/৪৩ দিন পরে এই আলোচনা প্রকাশিত হল। লেখার কোনও অংশ কোনও লেখা থেকে টোকা, নকল নয়। ©® অলোক কুমার কুন্ডু

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

তৃণমূলের প্রতি হুমায়নের হুঙ্কার ও বাবরি মসজিদ

তবে যদি হুমায়ূন কবির নাটক না করেন, তবে আগামী দিনে পশ্চিমবঙ্গে তিনটি দলকে দেখা যাবে যেখানে মুসলমান সমাজের ভাগ হওয়ার  আশঙ্কা থাকছে। তবে এইরকম হবে বলে যারা ভাবছেন, তা নাও হতে পার। কারণ হুমায়ূনের উদ্যোগে লক্ষাধিক জমায়েত হলেও হুমায়ূন কবিরের ব্যাকগ্রাউন্ড খুব একটা শক্তপোক্ত নয়। এখনও পরিষ্কার নয় এই বিষয়টি যে, হুমায়ূন কবিরের এই উদ্যোগ সত্যি কি-না ? কারণ নির্বাচন এলেই হুমায়ূন কবিরের এক একটা উদ্যোগ দেখা যায়। তবে যদি আজকের ঘটনা মনেপ্রাণে সৎ হয় তবে প্রথম ক্ষতি হবে তৃণমূলের। কারণ এই উদ্যোগের সঙ্গে গরিব মানুষকে জড় করতে পেরেছেন হুমায়ূন। উনি একটা মারাত্মক রেসিওর দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করেছেন। যা সাম্প্রদায়িক হলেও মুসলমান সমাজের প্রচলিত আকাঙ্ক্ষার প্রতি নজর ঘুরিয়েছেন। যেটা মুসলমান যুব সমাজের কাছে একটা বড় দাবি। কিন্তু এই যে হুমায়ূন কবির এই উদ্যোগ নিলেন, সেখানে স্পষ্ট করেছেন তিনি নিজেই যে, তার এই উদ্যোগের সঙ্গে শুধুমাত্র বাঙালি মুসলমানরা রয়েছেন। অর্থাৎ হায়দ্রাবাদ কেন্দ্রিক মুসলমান রাজনীতির সাহায্য তিনি চান না। তবে বহু মানুষ কিন্তু কি হিন্দু কি মুসলমান সমাজ থেকে এখনই এই বিষয়ে হয়তো ...

বোয়েলিয়া সর্বজনীনের ৫৫ বছর

নারীটের সিংহ পরিবারের দত্ত বাড়ির পুজো