কলকাতা ময়দানে রথের মেলা ও আমার কথা/
অলোক কুমার কুন্ডু
• ইতিপূর্বে ফেসবুকেই লিখেছিলাম, কলকাতায়, ইসকনের রথযাত্রা নিয়ে ও তার ইতিহাস নিয়ে।ময়দানে ( পার্কস্ট্রিটের ময়দান)-এ, ১৯৭৬ থেকে ইসকনের রথের মেলা চলে আসছে। ইতিপূর্বে ইসকনের রথযাত্রা পথের ভিডিও তুলেছি। ইসকনের রথের সঙ্গে সারা রাস্তায় দু-তিনবার গেছি। এমনকি আমার ভাতৃবধূ মিতা যখন থেকে ইসকনের লাইফ-মেম্বার হয়েছে, মনে হয় ওদের জীবনটাই অনেকটা পাল্টে গেছে, তখন থেকে ওদের ফাঁকেও বেশ কয়েকবার ইসকনের রথের মেলায় গেলাম। আমি এইসব ভালোবাসি বলে, মনে হয়, মিতা আমাকে একটু বেশি সঙ্গে নেয়। কিন্তু আমাদের পরিবারে অনেক মেম্বার, সবসময় আমি গেলে সকলে তো আর মেতে পারবে না। কিন্তু আমিও তো ইসকনে যেতে ভালোবাসি। ওদের পরিবেশ, ওদের ধর্মীয় আচরণ, বড় আকর্ষণীয়। তাই হোক, মা বলছিলাম, তার হলো, আমাদের পরিবারটা একটু সংখ্যায় বড়। আমরা প্রায় ন-পুরুষ একইভাবে ৩৫০ বছরের বাড়ির চৌহদ্দির মধ্যেই এখনও বাস করি। যদিও শখ করে দু-চারজন পাশাপাশি ফ্ল্যাট করেছে, সেটা অন্য কথা। আমাদের বড় পরিবার হলেও ধর্ম নিয়ে খুব বেশি মনে হয় পরবর্তীতে কেউ বড় একটা মাথা ঘামায় নি, ধর্মকে সামনে রেখে রথ, দোলে আনন্দ করেনি। কিন্তু এখনও আমাদের বাড়িতে শ্রীধর আর বাণেশ্বর জিউ বারোমাস থাকেন। এক একটি পরিবারের পালা পড়ে আমাদের গৃহদেবতার জন্য। কিন্তু আমরা সবকজনই বেশিরভাগ এখন চাকরিবাগরির লোক, হ্যাঁ দুচারজন ব্যবসায়ীও আছে। বহুকাল আগে আমাদের বাড়িতে দুর্গাপূজাও হতো, কিন্তু সেইসব ইতিহাস নেই আজ। সিনেমায় স্যুটিং হওয়ার মতো ঠাকুরদালানও দেখেছি- আমাদের। তার ছবি তুলতে এসেছিলেন নামিদামি ফটোগ্রাফাররা। গুলি-বন্দুক ও জাহাজের ব্যবসাও সেই কবেই রসাতলে তলিয়ে গেছে। স্থানীয় ময়রাপাড়ার মন্দিরটিও পারিবারিক পরিচর্যার অভাবে আজ পরিবারের অধিকারে নেই। কুন্ডু'রা তখনকার দিনের গুলিবন্দুকের একমাত্র আমদানি রপ্তানির এতবড় ব্যবসায়ী হওয়া সত্ত্বেও ঘোড়ার গাড়ি ও বিশাল আস্তাবল ( হাওড়ার একমাত্র পারিবারিক আস্তাবলটি এখন সেইভাবে বেঁচে আছে, সেখানে এখন গাড়ি রাখার জায়গা ) থাকা সত্ত্বেও বাইরে তাঁরা কোনো ধর্মীয় আচরণ করতো না বলেই মনে হয়। নিজেদেরই তো প্রকান্ড ঠাকুর দালান ছিল, ইংরেজ ইঞ্জিনিয়ারের বানানো। সেইসব ভাগবাটোয়ারায় নষ্ট হয়ে গেছে। আমাদের পুরনো ঘোড়ার আস্তাবলের কথা না জানার জন্য কেউ তার খোঁজ নেয়না কখনও, কিন্তু যখন দেবব্রত বিশ্বাস হাওড়ায় প্রথম এসেছিলেন, তখন তাঁকে এইখানে এনে প্রথম বসানো হয়েছিল।
অবশ্য সেটা আমাদের এক শরিকের এখন জায়গা। আস্তাবলের পরিকাঠামো সাইজ নষ্ট না করে তা সারানো হয়েছে ব্যবহারের জন্য।
• আমি অনেক জিজ্ঞাসা করে দেখেছি, গুলিবন্দুকের জাহাজডুবির পর, আমাদের প্রধানকর্তা যখন তাঁর সার্ভিস রিভলভার দিয়ে এই বাড়িতেই ৩০০ বছর আগে আত্মহত্যা করেছিলেন মনে হয় তখন থেকেই দুর্গাপূজা বন্ধ হয়ে যায়। যদিও আমাদের পরিবারের বসবাসের অনেক পরে হাওড়ার শ্যামাশ্রী সিনেমা থেকে রামরাজাতলা পর্যন্ত জল জমা জায়গা বলে পরিচিত ছিল। মে সব পআড়আ এখন দেখি এইসব অঞ্চলের প্রতিষ্ঠা হয়নি তখন, লোকের কোনও বসবাস ছিলনা। এখন থেকে ১৫০-২০০ বছরের বেশি আগে এইসবের উন্নতি হয়নি, কারণ লোহার বিম এসেছিল ১৫০ বছর আগে। হাওড়ায় কাঠের সঙ্গে লোহার বিমের বাড়ি মানে ১৫০-২০০ বছরের বেশি নয়। কারণ এইখানকার বাড়িঘরদোরে কাঠের সঙ্গে লোহারবিমের ব্যবহার বেশি দেখা যায়। গত দুবছর আগে যখন জানবাড়ি পড়ে যায়, তারমধ্যে লোহার বিমের ছবি পাওয়া গেছে, সংগ্রহ করেছি। তাই ঘোষপাড়ার রথ তখনও হয়নি। তার পরেই হবে। তাই ধরে নেওয়া যেতে পারে হাওড়ার ঘোষপাড়ার প্রিয়বাগিদের রথ-ই হাওড়া শহরের পুরনো রথ। তাই ধরেই নেওয়া যায় কালী ব্যানার্জী এবং আমরা হাওড়ার সমসাময়িক হলেও আমাদের পরিবারই হাওড়ায় সবচেয়ে আগে এসেছে। কারণ একমাত্র হাওড়া ময়দানে ( বর্তমান ডিএসপি টাউন ও আইবি অফিস) আমাদের জায়গা ছিল বর্ধমান মহারাজ প্রদত্ত জমি। আর কালী ব্যানার্জীদের জমিও বর্ধমান মহারাজ প্রদত্ত। আমাদের বসতবাড়ি জায়গাজমিও বর্ধমান মহারাজ প্রদত্ত। কিন্তু আমরা জায়গা পাই রাস্তার ধারে এবং ব্যানার্জীদের বসতবাড়িটি খানিকটা ভেতরে। তবে ওদের বাজারের অংশটিও বর্ধমান রাজ থেকে প্রাপ্য। যাইহোক ব্যানার্জীদের রথ ও দুর্গাপূজা দুটোই এখনও চলমান। ঐতিহ্য ওনারা বাঁচিয়ে রাখতে পারলেও আমাদের ঐতিহ্য বলতে কিছু নেই। তাই রথ কখনও হয়েছিল কিনা আমাদের জানা নেই। আবার হাওড়ায় সর্বপ্রথম গ্যাসের লাইটে আলো জ্বলতো শুধুমাত্র আমাদের বাড়িতেই। এ থেকেই বোঝা যায় কুন্ডুরা এই অঞ্চলের সবচেয়ে ধনী পরিবার ছিল। ধীরে ধীরে কুন্ডুরা ব্যবসা বিমুখ হয়ে পড়াতেই তাদের দিন দিন ক্ষয় হতে থাকে। তাই পুজোআর্চা আর নতুন করে বাঁচার রসদ হিসেবে বাড়িতে প্রবেশ করেনি। কিন্তু আমাদের পরিবার কিন্তু এখনও তাদের ৫০০ বছর আগের জাঙ্গিপাড়ার ঐতিহ্যের বাণেশ্বর ও শ্রীধরজিউ-এর পুজো চালিয়ে চলেছে, হাওড়াতে ৩৫০ বছর ধরে। রথের দিনে, দোলে, আগে ঘটা করে পুজো হতো। তবে পুজোকে কেন্দ্র করে আর খাওয়াদাওয়া, হৈচৈ হয়না আমাদের বাড়িতে। ইতিমধ্যে আমেরিকায় দুই কাকা আছেন, কিন্তু তাঁদের মধ্যে একজনের ছেলেরা আমেরিকার পাকাপাকি বাসিন্দা হলেও সেই কাকা-কাকিমা এখানেই বেশি সময়টা এখন থাকেন। কীভাবে জাঙ্গিপাড়ার কুন্ডুরা সারা দেশে ছড়িয়ে গেল হয়তো এই ইতিহাস কখনও রচিত হবে না। আমাদের এক ভাইপো আবুধাবিতে থাকে। মধ্য হাওড়ার কুন্ডুদের পদবি আরও বহুবছর আমেরিকায় থেকে যাবে হয়তো। চিনাবাজারের কাগজের ব্যবসার লাইসেন্স এখনও আমাদেরই আর এক কুন্ডুদের হাতেই। যদিও তাদের জায়গাজমিগুলি হাওড়ার কাসুন্দিয়ায় একটি বালিকা বিদ্যালয়কে তারা দিয়ে গেছে, কখনও আর ফেরত নিতে আসেনি, থাকেন রাসবিহারীতে, কলেজস্ট্রিটে। দেখাই যাচ্ছে
ঠাকুরদালানের কারণে বাইরে আর ধর্মকর্ম কুন্ডুরা করেনি এবং পুজোর ঐতিহ্য বজায় রাখেনি।
• হ্যাঁ শুরু করেছিলাম ইসকনের রথের মেলা দিয়ে।
আমাদের বৃহত্তর পরিবারের আমার এক ভাই আশীষ ও মিতা-র (স্ত্রী) মধ্যে হয়তো আমাদের বাড়ির কিছু ধর্মীয় ব্যাপার-স্যাপার নতুনভাবে এসেছে কিংবা পুরাতন ঐতিহ্যকে ধরে নতুন করে তৈরি হয়েছে। তাই ওরা বেশ কয়েক বছর ধরে, বাড়িতে একবার করে, একটি দিন ইসকন থেকে গৌর-নিতাই আনিয়ে একদিনের একটি আনন্দ অনুষ্ঠান করে থাকে, পুজোর আয়োজন করে। যেখানে হয় গীতা পাঠ ও বেদমন্ত্রের উচ্চারণ, ইসকনের সাধু-সন্ন্যাসীদের নাচগানের সঙ্গে আমাদের সকলেই যোগ দেয়। ইসকন থেকে আসে (রাজভোগ) থালা ভর্তি করে ভোগ। কখনও মেইন বসে রান্না হয়। পুজো-পাঠ হয়। যারা আসেন তারা সকলেই সেই ভোগ পায়। তবে প্রতিবছর নিয়ম করে করা যায় না ওইভাবে, এইরকম অনুষ্ঠান। অনেক সময়, সময়ের অভাবে ইসকনের কলকাতা মন্দিরে গিয়ে পুজোপাঠ মিতা করে আসে, সেখানে নানাভাবে অংশগ্রহণ করে। ওদের মেয়ে আমাদের সকলের আদরের স্নেহা-কে তাই ইসকনের মহারাজরা চেনেন, জানেন, স্নেহ করেন। এই কারণে ইসকনের লাইফ মেম্বারদের সম্মেলনেও আমরা অনেকবার অংশগ্রহণ করেছি। সম্মেলন বলতে পুজোপাঠ ছাড়া, মহাপ্রভুর আরাধনা ছাড়া কিছুই হবে না ইসকনে, আরাধনা মানে তো হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ, কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে, ঢোল, মৃদঙ্গ করতালের মিলিত ঝঙ্কার। কলকাতায় জাহাজ বা বিশাল লঞ্চের মধ্যে প্রতিবছর হয় ইসকনের নৌকাবিহার উৎসব গঙ্গাবক্ষে। আবার জগন্নাথের স্নানযাত্রা হয় কলকাতার ইসকন হাউসে। মাঝেমধ্যে আরও বিভিন্ন অনুষ্ঠানে মিতা আশীষ ও স্নেহা ওখানে উপস্থিত থাকে। আমরাও যাই। আর সব অনুষ্ঠানেই বিশালভাবে মহাপ্রভুর রাজভোগের (ভোগ) অংশ পেয়ে থাকি আমরা। তার মধ্যে ইসকনের রথের মেলায়, ময়দানে লক্ষ লোকের সমাবেশে হয়। কিন্তু আমরা যাই ওদের সঙ্গে লাইফ মেম্বারদের পাস পেয়ে। এবারেও গিয়েছিলাম।আমি মিতাকে, বলি, প্রতিবার খালি, আমি যাবো এইটা তো হয় না। হ্যাঁ মিতা সকলকেই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে নিয়ে যায় ইসকনের উৎসবগুলোতে।
কারণ আমাদের পরিবারের বসবাসের জায়গা প্রায় গায়েগায়ে। পারিবারিক সদস্য সংখ্যাও বেশ। আমি বরং মিতাকে বলি আমাকে বাদ দাও। কিন্তু আমি যে মাঝেমধ্যে ইসকনে একা একা চলে গেছি তা কাউকে না জানিয়েই, তা শুধুমাত্র ছবি তুলতে। ইসকনের রথের কথা বলতে গিয়ে কেন যে নিজেদের পূর্বপুরুষদের পরিচিতি টেনে আনলাম কে জানে? আসলে আমাদের পরিবার সম্পর্কে একটা কিছু লেখা দরকার, তাই এখানেই দুচার কলম লিখে দিলাম। কারণ এই লেখা ফেসবুকের জন্য নয়। এই লেখা আসলে গুগলের জন্য। সারা পৃথিবীর লোক পড়বে। যাঁরা ফেসবুকে আছেন, আমার সঙ্গে, তাঁরা সকলেই দেখেছেন আমার ভাইঝি এই কদিন আগে ইসকনের রথের মেলায় ভোগ বিতরণ করেছে-- নিজে হাতে। হ্যাঁ ওর বাবা-মাও করেছে এই ভোগ বিতরণ সেবা। স্নেহার নাম ভোগ বিতরণকারী হিসেবে লিখিত হয়েছে এবং ভোগে ওর প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ করার জন্য ইসকনের কৃপায় ওর নাম সংযুক্ত হয়েছে বিশাল সাইজের ফেস্টুনে। মেলা প্রাঙ্গণে। এইবারে রথের মেলায় গিয়েছিলাম --আমি, আমার এক ভাই প্রমথ, আর এক ভাতৃবধূ পায়েল, আমার বউ ও আমি। এছাড়া তো স্নেহা তো ছিলই আর ওর বাবা-মা। সকলেই ওই সেবা করতে পেরে আমরা আনন্দিত। প্রতিদিন আমাদের যে পাপ হয়, নানা কারণে, হয়তো এইরকম সেবার মাধ্যমে আমাদের সেই পাপগুলি খন্ডিত হয়। সেদিন এই কাজ করতে পেরেছি ইসকনের কৃপায়। ইসকনের সাধু, সন্ন্যাসী ও মহারাজদের কৃপা থাকায় মিতাকে ওঁরা বিশেষ ভালোবাসে, আমরাও পেলাম তাঁদের সেই ভালোবাসা। হয়তো আমার মধ্যে কোনও তেমন ধার্মিক ভাব ও ধারণা নেই। কিন্তু ময়দানে গিয়ে ইসকনের কৃপায় রথ দেখার জন্য মহাপ্রভু দয়া করে তাঁর রাজভোগের অংশ ( রসগোল্লা নয়) আমরা পেয়েছি ইসকনের সমস্ত লাইফমেম্বারদের সঙ্গেই। পেয়েছি বসে খেতে। লুচি, চপ, পায়েস, জিরারাইস, তরকারি, খিচুড়ি,আলুর দম। এই রাজভোগের আয়োজন থাকে ভেতরে ভিআইপিদের জন্য ও লাইফমেম্বারদের জন্য। বাইরে চলে যতবার খুশি খাও খিচুড়িভোগ, লাইন দিয়ে। ভিআইপি গেট দিয়ে ঢুকে প্রথমে আমরা সাতজন মিলে জগন্নাথদেব দর্শন করলাম। তারপর পুজো দেওয়া চরণামৃত নেওয়া। সারা মাঠ ঘুরে রথের সঙ্গে ইসকনের নানারকম স্টল দেখা চললো। মঞ্চে চলতে থাকে একদিকে ধর্মীয় নাটক, একদিকে কীর্তণের অনুষ্ঠান। মাঠ ঘুরতে ঘুরতে কীর্তনের কথাগুলো বড় মধুর করে কানে বাজতে থাকে। দূর থেকেও তার শোনা যায়। আমরা প্রবেশ করেছিলাম বিকাল ৫.০০ টায়, ফিরতে ফিরতে হলো রাত ৮.৩০ টা। জয় জগন্নাথদেবের জয় বলে যে যার ঘরে ঢুকলাম। সঙ্গে মিতাদের দুটো গাড়ি গিয়েছিল। আসার সময় ব্যাগ ভর্তি খিচুড়ি ভোগ সঙ্গে। বাড়ি ফিরে আয়নায় চোখ গেল তখনও চন্দনের ফোঁটাটা জ্বল জ্বল করছে।
-©® অলোককুমার কুন্ডু।
মন্তব্যসমূহ